পাপিয়ার ঘনিষ্ঠরা আতঙ্কে

নরসিংদী যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউর ঘনিষ্ঠদের তালিকা করছে র‌্যাব ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পাপিয়ার সঙ্গে কার কার যোগাযোগ ছিল, কারা তার ‘রংমহলে’ আসা-যাওয়া করতেন তারও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এতে পাপিয়ার আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা ও ঘনিষ্ঠদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনেক ঘনিষ্ঠের নামও বলেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এদিকে গতকাল সোমবার তিনটি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাপিয়া ও সুমন চৌধুরীকে ১৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

পাপিয়াকে নিয়ে গতকালও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্রই ছিল আলোচনা। পাশাপাশি এই দম্পতির কর্মকাণ্ড নিয়েও অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছে। র‌্যাব বলছে, জাল টাকা বহনের অভিযোগেই মূলত পাপিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে অবৈধ অস্ত্র, মাদক, অনৈতিক ব্যবসা, প্রতারণা, চাকরির তদবির বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, ক্যাডার বাহিনী লালনেও পাপিয়া ও তার স্বামীর সম্পৃক্ততা মিলেছে। এসব অভিযোগে এরই মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর

 দুটি থানায় তিনটি মামলা করা হয়েছে।

জানতে চাইলে র‌্যাব-১ অধিনায়ক শাফী উল্লাহ বুলবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাপিয়াসহ অন্যদের গ্রেপ্তারের পর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আমাদের কাছে যা যা তথ্য ছিল সবই প্রকাশ করেছি। তাদের রিমান্ডে এনেছে পুলিশ। তবে আমরা চাচ্ছি মামলাগুলো তদন্ত করতে। কারণ তাদেরকে আরও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। পাপিয়া ও তার স্বামীর সঙ্গে আরও কে কে আছে এসব বিষয় খুঁজে বের করব।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাপিয়া দম্পতির আশ্রয়দাতারা এখন রীতিমতো আতঙ্কে আছেন। কারণ তিনি ইতিমধ্যে র‌্যাবের কাছে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন সাধারণ পরিবারের সন্তান হলেও দুজনের মধ্যেই কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল মনোভাব ছিল। পাপিয়ার রাজনৈতিক পদচারণার পেছনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতারই হাত ছিল। ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করে তার কাছ থেকে অনেকেই ফায়দা লুটেছেন। আর পাপিয়াও লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সবার ‘চাহিদা’ পূরণ করেছেন। বেপরোয়া আচরণের জন্য তার ওপর ক্ষিপ্ত ছিল একটি মহল। এজন্য তার ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাও ঘটেছিল। ব্যবসাবাণিজ্য থেকে শুরু করে অনেক বড় বড় নেতা, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে পাপিয়ার। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের বশে আনার জন্য পাপিয়া ‘এসকট সার্ভিসের’ ব্যবসা শুরু করেন। এজন্য ঢাকা ও ঢাকার বাইরের গরিব ঘরের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া তরুণীদের চাকরি দেওয়ার নাম করে এনে জোরপূর্বক ‘অনৈতিক কাজে’ বাধ্য করতেন। তদবির বাণিজ্য হাসিলের জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে কমবয়সী তরুণীদের পাঠিয়ে দিতেন তিনি। এভাবে অল্প দিনেই তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান।

তিন মামলায় ১৫ দিনের রিমান্ড : পাপিয়ার বিরুদ্ধে রাজধানীর দুটি থানায় তিনটি মামলা করেছে র‌্যাব। এর মধ্যে শনিবার বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি এবং শেরেবাংলা নগর থানায় অস্ত্র আইনে একটি ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা করা হয়। বিমানবন্দর থানার বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে তাকে গতকাল আদালতে হাজির করা হয়। একইভাবে শেরেবাংলা নগর থানার মামলায়ও তার রিমান্ডের আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত পাপিয়া ও তার স্বামীর তিন মামলায় ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। আর তাদের দুই সহযোগীকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছে আদালত।

বিমানবন্দর থানার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী কায়কোবাদ পাপিয়াসহ চারজনকে গতকাল আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। আবেদনে তিনি বলেন, পাপিয়াসহ চার আসামি সংঘবদ্ধভাবে অবৈধ অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান ও জাল নোটের ব্যবসা, চাঁদাবাজি, তদবির বাণিজ্য, জমি দখল-বেদখল করে অনৈতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে। মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে আসামিদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার উৎস, জাল টাকা তৈরি চক্রের সক্রিয় সদস্যদের মূল হোতাকে গ্রেপ্তারসহ ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। আসামিপক্ষের আইনজীবী সওদাগর অ্যানী ও মশিউর রহমান রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন আবেদন করেন। দুপক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মাসুদুর রহমান ও মোহাম্মদ জসীম তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর মধ্যে বিচারক বিমানবন্দর থানার বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় পাঁচ দিন, শেরেবাংলা নগর থানার অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলায় পাঁচ দিন করে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ।

পাপিয়াকে দেখতে আদালতে ভিড় :  গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় পুলিশ পাপিয়াসহ চার আসামিকে আদালতে হাজির করে। আদালতের কাঠগড়ার পাশে একটি চেয়ারে তাকে বসানো হয়। পাপিয়াকে দেখার জন্য বিভিন্ন পেশা-শ্রেণির উৎসুক জনতা আদালতপাড়ায় ভিড় করেন। এ সময় অনেকেই পাপিয়া ও তার সহযোগীদের ছবি তোলেন। র‌্যাব জানিয়েছে, পাপিয়ার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে আরেকটি মামলা হবে। এ নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।