আইনস্টাইনের বাজি ও ব্যাংক খাতের নৈরাজ্য

লিখেছেন রাজেকুজ্জামান রতন

একটা বহুল প্রচলিত গল্প আছে আইনস্টাইন প্রসঙ্গে। একবার এক ব্যক্তি আইনস্টাইনকে প্রস্তাব দিলেন বাজি ধরার। বিনয়ের সঙ্গে তিনি বললেন, আইনস্টাইন আপনি তো জ্ঞানের ভাণ্ডার, ‘আপনার সঙ্গে তো আমার তুলনাই হতে পারে না। ফলে বাজি আমরা ধরব কিন্তু বাজিতে হারলে সমপরিমাণ টাকা দিতে হবে না। আমি উত্তর দিতে না পারলে আপনাকে দেব পাঁচ ডলার কিন্তু আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে দেবেন ৫০০ ডলার। কারণ বিজ্ঞান অথবা সাধারণ জ্ঞান যাই বলি না কেন, আপনি অনেক ওপরের মানুষ। তা প্রথম প্রশ্নটা আপনিই করুন। আইনস্টাইন জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলুন দেখি পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব কত?’ ভদ্রলোক কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বললেন, ‘স্যার সঠিকভাবে বলতে পারব না।’ আইনস্টাইন বিজয়ীর ভঙ্গিতে হাসলেন আর ভদ্রলোক পকেট থেকে পাঁচ ডলারের নোট বের করে টেবিলে রাখলেন। এরপর ভদ্রলোকের পালা, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলুন দেখি স্যার! পৃথিবীতে কোন প্রাণী তিন পায়ে হেঁটে পাহাড়ে ওঠে কিন্তু নামার সময় চার পায়ে হেঁটে নামে।’ আইনস্টাইন তার স্মরণশক্তির সর্বশেষটুকু প্রয়োগ করে, তার অভিজ্ঞতার ঝুলি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও উত্তর পেলেন না। অবশেষ তার সেই বিখ্যাত মাথাটা চুলকে নিয়ে বললেন, ‘পারলাম না।’ এবং পকেট থেকে বের করে দিলেন ৫০০ ডলারের নোট। এবার আইনস্টাইনের জিজ্ঞেস করার পালা। তিনি জিজ্ঞেস করার আগে বললেন, ‘আমি নতুন প্রশ্ন করার আগে আপনার প্রশ্নটাকেই আপনার কাছে রাখতে চাই। বলুন তো কোন প্রাণী তিন পায়ে পাহাড়ে ওঠে এবং চার পায়ে নামে?’ ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বললেন, ‘উত্তর জানা নেই’ এবং পাঁচ ডলার বের করে দিলেন পকেট থেকে। কৌশলের প্যাঁচে ফেলে আইনস্টাইনের টাকা নিজের টাকায় পরিণত করে ফেলা আর আইনস্টাইনকে বোকা বানানোর গল্প আমরা শুনেছি। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো নিয়ে গল্পের চেয়ে সত্যি যেসব ঘটনা আমরা দেখছি, তাতে আইনস্টাইন হয়তো স্বস্তি পেতেন এই ভেবে যে, তিনি অল্পের ওপর দিয়েই পার পেয়ে গেছেন। বাংলাদেশের ঋণখেলাপিদের পাল্লায় পড়লে তো তার আর উপায় ছিল না।

ব্যাংকব্যবস্থা নিয়ে প্রতিদিনের পত্রিকা আমাদের যে খবর সরবরাহ করে, তার বেশির ভাগ হতাশাজনক। ব্যাংক ঋণ দেয় বছর শেষে কত লাভ করবে, তা হিসাব করে লাভ তো দূরের কথা, সেই ঋণের টাকাই আর ফেরত আসছে না। ব্যাংকের মূল পুঁজি হলো আমানতকারীদের টাকা। এ টাকা চলে যাচ্ছে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে এবং এদের হাতেই জিম্মি দেশের ব্যাংক খাত। এটা সবাই জানে যে, ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ পেতে হলে ব্যাংক পরিচালক, ব্যাংকার সিন্ডিকেটকে ঘুষ দিতে হয়। কিন্তু তার পরিমাণ কত এবং এর পদ্ধতিইবা কী? এর একটা উত্তর পাওয়া যাবে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নইম নিজামের লেখায়। গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বাংলাদেশ প্রতিদিনের উপ-সম্পাদকীয়তে তিনি লিখেছেন, ‘কোনো এক এমপি সাহেব একটি সরকারি ব্যাংক থেকে ২০ কোটি টাকা ঋণ চাইতে গেলে তাকে ২০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।’ এমপি সাহেবসহ জামানতের সীমাবদ্ধতার কথা জানালে ব্যাংক চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে আসা কর্মকর্তা আশ্বস্ত করেছেন এই বলে যে, ‘কাগজপত্র নিয়ে চিন্তা নেই। প্রয়োজনে অন্য নামে নিন, কাগজপত্র আমরাই বানিয়ে দেব। শুধু আমাদের একটা প্রস্তাব শুনতে হবে আমাদের ১০ শতাংশ টাকা দিতে হবে। হংকং চলে যাবে এই টাকা। আপনার টাকা আপনি দেশে রাখবেন না বিদেশে পাঠাবেন সেটা আপনার ব্যাপার।’ এটি একটি ঘটনা এবং অসংখ্য ঘটনার মধ্যে একটি। কিন্তু ফুটে উঠেছে সমগ্র চিত্র। কী অদ্ভুত! টাকা আমানতকারী জনগণের, ঋণ দেবেন ব্যাংক পরিচালক এবং নির্বিঘেœ পাচার হয়ে যাবে হংকং। এমনি করেই কি গড়ে উঠছে কানাডার বেগমপাড়া আর মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম?

প্রশ্ন হচ্ছে, টাকা তো এমনি এমনি ব্যাংক থেকে চলে যায় না। অতীতে একসময় মাঝেমধ্যেই খবর আসত ব্যাংক ডাকাতির। এখন সেসব খবর আসে না। কিন্তু ডাকাতি তো থেমে নেই। পদ্ধতিটা আধুনিক ও ঝুঁকিবিহীন হয়েছে। ওপর মহলের সঙ্গে সংযোগ, কলম আর কারসাজি করার মতো বুদ্ধি থাকলে বন্দুক নিয়ে ডাকাতি করার ঝুঁকি কেন নেবে ডাকাতরা? একটা ব্যাংকের শাখা অফিসে আর কয় টাকাইবা থাকে! বড় ডাকাতি করতে হলে কেন্দ্রীয়ভাবে করতে হবে এবং যারা করছেন তারা কেউ চুনোপুঁটি নন, রাঘববোয়াল-বড় ব্যাংক ডাকাত। তাই কেন্দ্রীয়ভাবে হাজার কোটি টাকা নিয়ে ফেরত না দেওয়ার দৃষ্টান্ত অসংখ্য। নিয়মবহির্ভূত ঋণ দেওয়ার কারণে হলমার্ক, এনন টেকস, বিসমিল্লাহ, বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক এসব নাম প্রচারমাধ্যমের সুবাদে এখন মানুষের মুখে মুখে। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার বা ৮০৮ কোটি টাকা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি করার ঘটনাও মানুষের জানা। ব্যাংক হচ্ছে সাধারণ মানুষের আমানত সুরক্ষিত রাখার স্থান। সেখান থেকে চুরি হয়ে যাওয়া বা জনগণের আমানতের টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার সাহস এবং প্রয়োজনে তাদের আরও ঋণ দেওয়ার সুপারিশের মধ্যে সংযোগ খুঁজতে গেলে দেখা যায় তারা সবাই ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ের মানুষ। ক্ষমতা ও দুর্নীতির মেলবন্ধন যেন অর্থনীতি ও জনগণের আস্থা ধ্বংস না করে সে কারণেই তো রক্ষাকবচ হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল কিছু নিয়মকানুন। এই নিয়মকানুনগুলো কি দুর্বল, নাকি ক্ষমতাসীনদের শক্তির কাছে অসহায়, তা যাচাই করা প্রয়োজন। নাকি পুরনো প্রবাদ নতুন রূপে আবির্ভূত হলো যে, আইন হচ্ছে মাকড়সার জালের মতো যাতে ছোট ছোট পোকা মাকড় আটকে যায় কিন্তু যা বড় পাখিকে ধরে রাখতে পারে না। বড় পাখিরা ঠিকই মাকড়সার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের ব্যাংকগুলো ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ৯ লাখ ৩২ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এ টাকার কত অংশ ঋণখেলাপি? অর্থমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৯১ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০১৯ সালের জুন মাসে এর পরিমাণ ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছেই। বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম ‘ব্যাংকিং খাত নিয়ে উল্টাপাল্টা পদক্ষেপ বন্ধ করুন, ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন করুন’ প্রবন্ধে হিসাব করে দেখিয়েছেন খেলাপি ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বেশ চাতুর্যপূর্ণ। তার মতে, ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের সঙ্গে যুক্ত হবে আদালতের ইনজাংশনের কারণে ঝুলে থাকা ৭৯ হাজার ২৪২ কোটি টাকা, স্পেশাল মেন্সন অ্যাকাউন্টের ২৭ হাজার ১৯২ কোটি টাকা এবং নিয়মবহির্ভূত রিশিডিউলিং করা ২১ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। সর্বসাকুল্যে ২ লাখ ৪০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। এর সঙ্গে রাইট অফ করা মন্দ ঋণ ৫৪ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা যোগ করলে হয় ২ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। ৩০ জুন ২০১৯ সাল পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ৬২ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা আর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ শতাংশের বেশি। ঋণের ৩০ শতাংশ যদি খেলাপি হয়, তাহলে ব্যাংক খাত টিকবে কীভাবে? অথবা পাশের দেশ নেপালে যদি খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ দশমিক ৭ শতাংশ হয়, তাহলে ওরাইবা এটা নিয়ন্ত্রণ করছে কীভাবে? অর্থমন্ত্রী সংসদে শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছিলেন তার পর কী হল? দেখা যাচ্ছে, যারা বড় ঋণখেলাপি তারা তত বেশি ক্ষমতাঘনিষ্ঠ। তাদের অনেকেই ভিআইপি বা সিআইপির মর্যাদা নিয়ে দেশ-বিদেশে ঘোরেন। তারা ঋণখেলাপি জেনেও তাদের ঋণ দেওয়ার প্রয়োজনে ব্যাংকের নিয়ম-কানুন পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলা হয়।

বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত এক পরিকল্পিত নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে চলছে। রাজনীতিকে উপরি কাঠামো হিসেবে দেখা যায় কিন্তু যা সাধারণ চোখে দেখা যায় না অথচ যার প্রভাব ব্যাপক ও বিস্তৃত তা হলো অর্থনীতি। তাই বলা হয়, অর্থনীতি হচ্ছে রাষ্ট্রের ভিত্তি। এই অর্থনীতিতে ঝাঁকুনি লাগলে তার প্রভাব রাজনীতিতে পড়ে ব্যাপকভাবে। অর্থনীতিতে লুণ্ঠন আর রাজনীতিতে দুর্বৃত্তপনা দেখতে দেখতে কেউ কেউ ভাবছেন এর কি কোনো শেষ নেই? কিন্তু দেশ ও তার অর্থনীতি বাঁচাতে হলে এর শেষ তো করতেই হবে। আবার ইতিহাস শিক্ষা দেয় কোনো অনিয়ম-অবিচারের শেষ করতে হলে কোথাও থেকে প্রতিবাদের শুরু তো করতে হয়। জনগণের হতাশা বা নিষ্ক্রিয়তা কোনো সমস্যারই সমাধান আনে না। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে যে কাঠামোগত দুর্বলতা ও দুর্নীতির মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে এবং ক্রমাগত বাড়ছে, সেখান থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই।

লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট