লন্ডনে বাংলা ভাষা রক্ষার দাবিতে সমাবেশ ও আন্দোলনের ডাক

জুয়েল রাজ, লন্ডন থেকে

বাংলাদেশের বাইরে যুক্তরাজ্যকে বলা হয় তৃতীয় বাংলা। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে লন্ডনে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে বাংলা ভাষা শিক্ষা ও চর্চা চলে আসছে। লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটে কাউন্সিল, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশি বাংলা ভাষাভাষীদের বসবাস। গত ১৮ ডিসেম্বর টাওয়ারের ক্যাবিনেট মিটিংয়ে কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ সার্ভিস বন্ধ করে দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আর এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলা ভাষাভাষীগণ। কাউন্সিলের সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠছে কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠন।

টাওয়ার হ্যামলেটসে কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ সার্ভিস বন্ধের প্রতিবাদে বাংলাদেশ টিচার্স এসোসিয়েশন ইউকে (বিটিএ)সহ অন্তত ৪০টি সংগঠনের সম্মিলিত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে গত শনিবার। কমার্শিয়াল রোড়ের লন্ডন এন্টারপ্রাইজ একাডেমিতে এই বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

বিটিএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ আবু হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল বাসিত চৌধুরী ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডক্টর রোয়াব উদ্দিনের শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ সার্ভিসের অতীত এবং বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন।

১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ টাওয়ার হ্যামলেটসে অভিবাসী পরিবারের বাচ্চাদের মাতৃভাষা তথা লেখাপড়ার উন্নয়নে দীর্ঘ ৪০ বৎসরের সাফল্যমণ্ডিত প্রভিশনের সমাপ্তি হতে যাচ্ছে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি বাজেট অধিবেশনে। ১১টি ভাষার সমন্বয়ে কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ সার্ভিস বা সিএলএস প্রায় ৪২ টি অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে পনেরশো শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করে থাকে। যার সিংহভাগই বাংলা ভাষাভাষী।

টাওয়ার হামলেটস কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে বাজেট কর্তনের মাধ্যমে জিএসসি এবং এ লেভেল বন্ধ করে দেয় আইকেএস ১ থেকে কে এস ৪ লেখাপড়া উন্নতির কল্পে এর ভূমিকা ব্যাপক। বর্তমান প্রেক্ষিতে প্রায় ৮০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এই কমিটির সার্ভিসের আওতায় কাজ করে থাকেন।

কাউন্সিলের ক্যাবিনেট মিটিংয়ে গত ১৮ ডিসেম্বর মেয়রের নেতৃত্বে কেবিনেট ৩ জন বাঙালি কেবিনেট মেম্বার ও একজন ডেপুটি মেয়র থাকা সত্ত্বেও কমিউনিটি সার্ভিস বন্ধের বিপক্ষে কোনো কথা বলেননি। এটা দুঃখজনক হলেও সত্যি যে প্রায় ২১ জন বাঙালি কাউন্সিলর থাকা সত্ত্বেও লেবার দলীয় গ্রুপে এটা আগেই গৃহীত হয়ে যায়।

বক্তারা তাদের বক্তৃতায় এই ঘৃণিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তারা বলেন এটা ইন্সটিটিউশনাল রেসিজমের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। এটা কোনভাবে মেনে নেয়া যায়না। কাউন্সিলররা আমাদের ভোটে নির্বাচিত। কিন্তু তারা কমিউনিটির স্বার্থের পরিপন্থী কাজে ব্যস্ত।

তারা আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে মাতৃভাষা ছিনিয়ে নিতে চায়। লেখাপড়ায় উন্নতি গতি থামিয়ে দিতে চায়।। এবং টাওয়ার হ্যামলেট থেকে বাঙালি খেদাও ও বিভিন্ন ষড়যন্ত্র চলছে। বক্তারা বলেন, আমরা যদি সকলে একাত্মবোধ হয়ে এই কমিউনিটি ল্যাঙ্গুয়েজ সার্ভিস প্রচলিত না রাখতে পারি তাহলে তাদের ষড়যন্ত্রগুলো একের পর এক বাস্তবায়িত হবে।

বক্তারা জোর দাবি করে বলেন
১) যদি কমিউনিটি সার্ভিস পুনর্বহাল না হয় তবে আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি মেয়র এবং কাউন্সিলরদের শহীদ মিনারে স্বাগত জানানো হবে না।

২) যদি সিএ এল এস পুনর্বহাল না হয় তবে মেয়র এবং ডেপুটি মেয়র সহ সকল বাঙালি ক্যাবিনেট মেম্বারদের সামাজিকভাবে বর্জন করা হবে।

৩) সমগ্র সংগঠনগুলো মিলে অচিরেই আলতাব আলী পার্কে গণসমাবেশ হবে

৪) আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি মালবারি প্যালেসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হবে

৫) কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ অচিরেই মেয়র এবং কাউন্সিলরদের সঙ্গে বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সভায় অতিথির মধ্যে বক্তব্য দেন আহমাদুস সামাদ চৌধুরী চেয়ারম্যান চ্যানেল এস টেলিভিশন, ড. হাসনাত এম হোসেন এমবিই পেট্রোন গ্রেটার সিলেট কাউন্সিল, টাওয়ার হামলেটস প্যারেন্টস সেন্টারের ডাইরেক্টর ডক্টর আবদুল হান্নান, বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের প্রধান উপদেষ্টা শাহগির বক্ত ফারুক, কাউন্সিল অফ মস্ক এর চেয়ারম্যান মাওলানা শামসুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই সিনিয়র সভাপতি দেওয়ান গৌস সুলতান, লেবার দলীয় বি এ এম ই এ’র সভাপতি জুনেদ আহমেদ সুন্দর, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এমদাদুল হক চৌধুরী, গ্রেটার সিলেট এর সভাপতি ব্যারিস্টার আতাউর রহমান সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।