সময়রেখা ::: তিন অধ্যায়…

লিখেছেন মাহমুদুল হাসান রুবেল

০৭/০৭/০৭ ::: প্রথম অধ্যায় :

ইমরান এবং রাসেল ভার্সিটির ক্যান্টিনে বসে কথা বলছে। আর পাশাপাশি চা-সিঙ্গারা চলছে । ইমরান চাপা স্বভাবের ছেলে । আর রাসেল ভীতু টাইপের ছেলে । দুজনেরই ভার্সিটিতে ভর্তি হলো দুই বছর হয়ে গেল । কিন্তু প্রেম করা হলো না । এটাই তাদের আফসোস । ভার্সিটির মেয়েরা তাদের পছন্দ করে । তবে এর পিছনে অন্য কারণ । ভালো ছাত্র হওয়ায় তাদের সাথে মেয়েরা খুব আন্তরিক । সবকিছুর পিছনে “শিট পারপোর্সেস” । এতেই দুজন খুশি । কারণ তাদেরকে তো মেয়েরা পাত্তা দেয় ।

আজ ক্যান্টিনে বসে ইমরান অপেক্ষা করছে তৃণার জন্য । তৃণাকে ইমরানের খুব পছন্দ । তৃণাকে দেখলেই ইমরানের মনটা কেমন যেন হয়ে যায়-ভালো লাগার, ভালোবাসার প্রাপ্তিতে। কোন কিছুতে মন বসাতে পারে না । ০৭.০৭.০৭ আজকের তারিখ । লাকি সেভেন । তাই ইমরান তার মনের কথা বলার জন্য এই দিনটাকে ঠিক করলো । তৃণাকে কি বলবে তা সে বাসার বাথরুমে গিয়ে প্রাকটিস করেছে আয়নার সামনে । ইমরানের আরেক বন্ধু শুভ । তাকে “লাভগুরু” মানে । কারণ ২মিনিটে মেয়েকে প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছে শুভ । শুভ-এর দেয়া নির্দেশনা পালন করলো ইমরান ।

তৃণা নীল একটা কামিজ পড়ে ক্যান্টিনে আসলো । ইমরানের পাশে বসে জানতে চাইলো, এ্যাসাইমেন্ট এর খবর কি ? ইমরান কোন জবাব না দিয়ে ইশারা দিয়ে রাসেলকে দেখালো । রাসেল বললো, ভালো । তারপর আগের পরিকল্পনা মতে রাসেল উঠে চলে গেল । ইমরান তৃণার দিকে তাকিয়ে ইশারায় বললো চুপচাপ থাকো । তারপর সে কিছুক্ষনের জন্য চোখ বন্ধ করে মনে মনে আবার প্রাকটিস করলো কি বলবে ? তৃণা তো অবাক হয়ে গেল । চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় ইমরান অনর্গল বলে গেল,

মুখের ভাষা-শুনেছি কিছু থাকে চোখে ।
তুমি কখনোই তাকাওনি আমার দু’চোখে ।
তাকালে দেখতে পেতে চোখের ফ্রেমে
মোনালিসার বদলে ঝুলছো তুমি নিজেই ।

এ কথাগুলো বলার পর চোখ খুললো ইমরান । চোখ দুটি বড় করে তাকালো তৃণার দিকে । আবার বললো, আমার চোখের দিকে তাকাও । কিছুই কি দেখতে পারছো না ?
তৃণা হাসতে হাসতে বললো,আমাকে তো দেখতে পাচ্ছি না । মোনালিসাকেই দেখতেছি । কথা শেষ করতে দেয় না ইমরান । তৃণার হাত ধরে বলে, আমার সাথে ফাজলামি কইরো না । একটু বুঝার চেষ্টা করো ।
তৃণা হাসতে হাসতে বললো, বুঝলাম তো । কিন্তু আমার তো….। আবারও কথা বলতে দেয় না ইমরান । দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বলে উঠে,
নেই,এমন কোন নারী নেই
যার ঠোঁট দেখে মনে
হবে সেখানে সে অযত্নে
রেখেছে সাগরের সব উত্তাল ঢেউ ।
চোখের দুই কালো মণি
দিয়ে শুষে নিয়েছে আকাশের
সব কালো মেঘ ।

তৃণা বিব্রত হয়ে পড়ে । সবার চোখ তাদের দিকে । তৃণা শুধু বলে যায় । পরে কথা হবে । তারপর প্রায় এক বছর তাদের মধ্যে এমন একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে যাকে বলা যায় উদ্দেশ্যহীন । কারণ তৃণা কখনো বুঝতে দেয় না । সব সময় রহস্যময়ী ছিল ।

০৮/০৮/০৮ ::: দ্বিতীয় অধ্যায় :

তৃণা এবং ইমরানের গ্রাজুয়েশন শেষ হলো । এক মাস হতে চললো দুজনের কারো সাথে কোন যোগাযোগ নেই । তৃণার মোবাইল বন্ধ ভার্সিটির শেষদিনের পর থেকে । ইমরান ই-মেইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলো । প্রথম ইমেইলটি ছিল এরকম —
প্রতিটি প্রতীক্ষায় কোন না কোন
লোভ লুকিয়ে থাকে ।
আমি লোভবিহীন এক প্রতীক্ষায় হয়তো
ছিলাম- যা আমি নিজেই জানতাম না ।
কেউ কি নিজেকে সবটুকু বোঝে ?

তৃণার পক্ষ থেকে কোন রিপ্লাই না পেয়ে আরেকটা ইমেইল দিলো ।

পৃথিবীর আর্বজনাগুলো
দু’হাতে সরিয়ে নয়,
প্রয়োজনে পৃথিবীটাকেই দু’পায়ে
ঠেলে সরিয়ে দেব ।

তারপর……..
আমরা দু’জন দু’জনের…..

তৃণা এবার উত্তর দেয় । বলে, আমার তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে । ০৮.০৮.০৮ইং তে আমার বিয়ে ।

ইমরান জবাব দেয় ।
আমি জানি তোমার কোথাও আজ আমি নেই,অথচ এই আমিই একদা তোমার সবকিছুতেই প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়াতাম । ছিলাম তোমার কন্ঠের রবীন্দ্র সংগীতে । পার্কের এক টাকার মুড়ির ঠোঙায় । ছিলাম তোমার পাঠ্য ও গল্পের বইয়ের পাতায় পাতায় । তুমি সুখী হও । তুমি তো আমার ভালোবাসার মূল্য দিলা না । আমার ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা হাসিটুকুই তুমি কেবল দেখেছো । তার মাঝে লুকিয়ে থাকা বিষন্নতা দেখোনি । দেখোনি সেই হাসির আরো গভীরে লুকিয়ে থাকা এক আশ্চর্য বিপন্নতা । অশ্রুভেজা হাসি পুরুষকে মানায় না । পুরুষ হবে চিতাবাঘ । আমি খরগোশ,ইঁদুর,আরশোলা । তাই থাকি সব সময় বিপন্ন বিষন্ন । এসব লুকাতে ঠোঁটে রাখি হাসি । যাই হোক, শুভ কামনা রইলো তোমার নতুন জীবনের জন্য ।

যথাসময়ে বিয়ে হয়ে গেল তৃণার ।

০৯/০৯/০৯ ::: তৃতীয় অধ্যায় :

এক বছর বাউন্ডুলে জীবন কাটায় ইমরান । জগত সংসারের কোন কিছু তাকে আর্কষন করতে পারেনি আর । প্রচুর লেখালেখি করে । পত্রিকায়ও ছাপতে থাকে । তার লেখার কিছু অংশ ভালোই আলোড়ন তুলে সবদিকে । আলোড়ন তোলা কিছু লেখার অংশ একটা বৃহৎ অংশের মনকে নাড়া দিয়ে যায় । যেমন-

“কী পেলাম…
সেটা বড় কথা নয় ।
কী পাইনি…
সেটাই বড় কথা ।”

“নারী এবং প্রেম যে বিপরীত
দুটো শব্দ তা বোঝার মতো
ক’জন সুস্থ লোক আছে পৃথিবীতে ?”

ইমরানের লেখা পড়ে একদিন তৃণা ফোন দেয় । ইমরান কোন কথা বলেনি । তৃণা শুধু বলে গেছে ।
–ইমরান, তোমার লেখাগুলো সব কষ্টের হয় কেন ?
–জানি না ।
–তুমি সুখের-আনন্দের কবিতা লিখতে পারো না ?
— আসে না ।
–এখনো তুমি আমার মোহ থেকে বের হতে পারো নি ?
— কিভাবে পারবো ? প্রথম প্রেম যে ছিল…
–তুমি পাগল । বিয়ে-টিয়ে করে সংসার করো সব ঠিক হয়ে যাবে ।
— ভয় করে । বিয়ে করা বউকে কি সুখী করতে পারবো ? সবটুকু ভালোবাসা দিতে পারবো ?
— এতো আবেগী হলে কেমনে চলবে ? চেষ্টা করো । আমি তো আছি । সব রকমের চেষ্টা করবো । তোমার বাবাকে বলো মেয়ে দেখতে ।
–বিয়ের জন্য মেয়ে খোঁজা হচ্ছে । বাবার আবিস্কার করা কিছু মেয়ে না দেখেই নাকচ করে দিয়েছি । বাবা তো খুঁজে বের করবেন সেই রকম মেয়ে যেমনটি হলে তিনি বিয়ে করতেন ।
–হাহাহাহা ।
–আজ কত তারিখ জানো ?
–কেন ০৯.০৯.০৯ ।
— ৯ হলো পতন সংখ্যা ।
–কিভাবে ?
–১০ ভিত্তিক সংখ্যা ব্যবস্থায় ০-৯ এর পর আবার ১০ মানে ০ থেকে গণনা শুরু হয়। অর্থাৎ ৯ এ এসে সংখ্যা পিরামিডের পতন হয়। তাই ৯ হচ্ছে পতন সংখ্যা ।
–এতো জ্ঞানের কথা বুঝি না । ভালো কিছু বলো ।
–আমাদের প্রথম প্রপোজাল দেয়া হয় কবে জানো ?
–না,মনে নেই ।
–০৭.০৭.০৭ । মনে করেছিলাম লাকি নাম্বার । আসলে তা সত্যি হয়নি । তবে তোমার বিয়ে হয়েছিল ০৮.০৮.০৮ । অগাস্ট মাসটা শোকের মাস ধরলে আমার দিকে ঠিক আছে । কিন্তু তোমার দিকে আনন্দের মাস ।
–প্লিজ ইমরান চুপ করো । আমি ফোন রাখলাম । বাই । টেইক কেয়ার ।

ফোন রেখে ইমরান ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়লো । তার হাতে এক ঘন্টার মতো সময় আছে । নাহলে ০৯.০৯.০৯ তারিখ চলে গিয়ে ১০.০৯.০৯ হয়ে যাবে । দ্রুত গতিতে ইমেইল দিলো তৃণাকে ।

“তোমার ইচ্ছাকে মেনে নিয়ে যে রাতে তোমার জীবন থেকে আমি চলে যাবো,সে রাতে আচমকা আকাশ ছেয়ে যাবে অন্ধকার মেঘে,ভয়ঙ্কর ঝড়-বৃষ্টি হবে,পানিতে ভরে উঠবে তোমার সামনের ঐ ঝিলটি । বিদ্যুৎ চমকাবে ঘন-ঘন । আর সেই বিদ্যুতের আলোয় ইচ্ছার বিরুদ্ধেও তুমি দেখতে পাবে আমার চলে যাওয়া । আর ঝিলের জলে তুমি বারবার দেখতে পাবে– আমার নয়, তোমার নিজেরই সুন্দর দুটি চোখ–সুন্দর অশ্রুতে ভেজা । হাতের ইশারায় পেছন থেকে তুমি আমাকে ফেরাতে চাইতেও পারে । কিন্তু আমি তো তখন খুঁজছি হারিয়ে যাবার পথ ।……

আমি তোমার বাসার সেই ঝিলের সামনে আসবো শেষবারের মতো তোমাকে দেখার জন্য । তুমি কি আমাকে একটু ফোন দিয়ে জানাবে তোমার বাসার ঠিকানা …..”