রনাঙ্গন ১৯৭১ : মুক্তিযোদ্ধার জীবন কাহিনী

লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ এয়াকুব

আজ একটি লাল সবুজ পতাকার জন্য আমার জীবনের শেষ যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছি, ১৫ই ডিসেম্বর রাতের শেষ প্রহরে জীবনের এক শেষ মরন যুদ্ধের রাতের অন্ধকারের কাহিনী। নীরবে কাঁদছি, যদি আর ফিরে না আসি। মা-বাবাকে আর দেখে আসতে পারলাম না।
অস্ত্র হাতে নিয়ে তিন বাহিনীর কমান্ডার যৌথভাবে পাক সেনাবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমন করার জন্য ১৫ই ডিসেম্বর শেষ রাতে ফজরের নামাজের পরপরই আমরা সবাই সারিবদ্ধভাবে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে রাবেয়া ওয়ার্কশপের পেছনের রাস্তা দিয়ে বড় নালা পার হয়ে সোজা নছু মালুম লেইন হয়ে বারিক মিয়াদের বাড়ি ঘেষে মাঝির ঘাট রোডের পদ্মা অয়েলের অফিসের নিকটে আমরা রাস্তার দুই পাশে তিন বাহিনীর সব মুক্তিযোদ্ধারা নিজ নিজ পজিশনে চলে গেলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম গ্রুপ বরিশাল স্বন্দীপের মাঝির ঘাটের (নৌঘাটের) পদ্মা অয়েলের অফিসের বিপরীতে কর্ণফুলী নদীর পাশে পাক সেনাবাহীনির খুব নিকটে পজিশন নিলো। দ্বিতীয় গ্রুপ পদ্মা অয়েলের অফিসের পুকুরের পাশে এবং ছাদের উপর পজিশন নিলো। তৃতীয় গ্রুপ মাঝির ঘাট রোডে মেইন রাস্তার দুই পাশে পদ্মা অয়েলের বাউন্ডারি দেয়ালের রাস্তার পশ্চিম প্রান্ত থেকে সাহেব পাড়া রাস্তা ঘেষে আমরা নিজেদেরকে সেইফ সাইডে রেখে পজিশনে চলে গেলাম। যুদ্ধকালীন সময় পাকিস্তানী সেনাবাহীনি মাঝির ঘাট রোড সদর ঘাট রোডের দক্ষিণে কর্ণফুলী নদীর নিকটবর্তী নৌকা পারাপারের ঘাটের খুব নিকটে একটি ক্যাম্প করেছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা তিন গ্রুপ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা একসাথে পাক সেনাদেরকে আক্রমণ করতে শুরু করি। দুই পক্ষের মধ্যে ঘন্টার পর ঘণ্টা গুলাগুলি হওয়ার পর রাস্তা ঘাট জনমানবশূণ্য হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ ভাবতেই পারেনি মুক্তিযোদ্ধারা পাক সেনাদের চারদিকে ঘেরাও করে এভাবে আক্রমণ করবে। যখন ভোর হলো, সূর্য্য আলোতে আমরা দেখলাম আমার মেজ ভাই জহুর আহমেদের শরীরে গুলি লেগেছে। আমরা কেউ পজিশন ছেড়ে আসিনি। মাঝে মাঝে একটা দুইটা ফায়ার হচ্ছে। এভাবে ১৬ই ডিসেম্বর দুপুর পর্যন্ত চলতে লাগলো। এর মাঝে পাকিস্তান আর্মি জানতে পেরেছে নিয়াজী অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছে ঢাকায়। আমাদের মনোবল বেড়ে গেল আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে গেল। আমরা ফায়ারিং এর পরিমাণ বাড়িয়ে দিলাম। এর মাঝে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না বলে খবর আসে। আমাদের তিন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার উচ্চ পদস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ করে। এর কিছুক্ষণ পর দেখলাম ভারত বাংলাদেশের যৌথবাহিনী মাইকিং করতে লাগলেন পাক বাহিনীকে অস্ত্রসহ স্যারেন্ডার করতে। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে তারা যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করলো।
এর মধ্যে আমরা নিশ্চিত হলাম বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে, স্বাধীন হয়েছে। সে কী আনন্দ, তা লিখে বুঝানোর মতো না সেই অনুভূতি। সেই সুখ অনুভূতি আজও আমার হৃদয়কে আন্দোলিত করে। যাহোক এর মধ্যে জানতে পারলাম কে বা কারা আমার গুলিবিদ্ধ ভাইকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে নিয়ে যায়। ছুটে গেলাম সেখানে অস্ত্র হাতে নিয়ে। ভাই তখন অপারেশন রুমে। অনেক সময় নিয়ে অপারেশন করে গুলি বের করা হলো। ভাইকে অনেকদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল।
দেশ স্বাধীন হলেও মনে অনেক দুঃখ ছিলো বিগত নয় মাসে পাক বাহিনী আমাদের মা-বোনদেরকে কিভাবে অত্যাচার করেছে চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে তার প্রতিশোধ আরো কঠোরভাবে নিতে পারলাম না বলে। আমাদের ভাইদেরকে চট্টগ্রাম পাহাড়তলি ঝাউতলা রেলস্টেশনে ট্রেন লাইনে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমি ভুলতে পারিনি বলে রাতের অন্ধকারে অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধে। আমার একটি গুলি যদি তাদের বুকে লাগতো তবে আমার হতভাগ্য মা-বোনের ইজ্জতের কিছুটা হলেও শোধ হতো। আমি খুব অল্প বয়সে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম প্রতিশোদের নেশায়।
যুদ্ধ শেষে আমার জীবনের শেষ অস্ত্র স্টেনগানটি জমা দিয়ে আবার চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল মডেল হাই স্কুলে দশম শ্রেণীতে ফিরে যাই। স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকগণ আমাকে ফিরে পেয়ে কি খুশি আর আনন্দ করলো আজও ভুলি নাই। আমার সেই শিক্ষকগণ আজ আর কেউ বেঁচে নাই। আমরা এক পরিবারের চার ভাই মুক্তিযোদ্ধা। তারা হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফ্ফর আহমেদ (চট্টগ্রাম মহানগর কমান্ডার), হাজী সুলতান আহমেদ, জহুর আহমদ এবং আমি। আমাদের যৌবনের সেরা সময়টাকে আমাদের দেশমাতাকে শত্রুমুক্ত করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। এটা আমাদের জন্য যেমন আনন্দের এবং গর্বের তেমনি তৃপ্তির। কারণ দেশের ডাকে সাড়া দেয়ার সৌভাগ্য সবার হয় না।