কেমন যাবে ২০২০ সাল?

মহিউদ্দিন আহমেদ, (টরন্টো)

কেমন যাবে ২০২০ সাল? এ প্রশ্ন হয়তোবা অনেকেরই মনে জাগছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাণ্ডলো যেমন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ( ওয়ার্ল্ড ব্যাংক) এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) এর মতো বিশ্বের বিশিষ্ট সংস্থাণ্ডলি পূর্বাভাস দিচ্ছে যে এ বছরটি বিশ্বের পরাশক্তিদের আধিপত্য বিস্তারের সংঘাতে জড়িত থাকবে এবং সে যুদ্ধের এজেন্ডা থাকবে বিশেষ করে বাণিজ্য যুদ্ধ, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি, বিপর্যয়মূলক প্রযুক্তির উন্নয়ন ইত্যাদি নিয়ে মানব জাতীর অকল্যাণকর কাজকর্মে ও ঘটনায় নিবদ্ধ থাকবে। সম্পদের ভারসাম্যহীন ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদ অর্জনে সমান প্রবেশাধিকার ইত্যাদির অভাব থাকার কারণে ধরে নেয়া হচ্ছে এ বছরটি বিশ্বব্যাপী অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচার এবং মিডিয়ার মিথ্যা প্রোপাগান্ডার আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকবে!
দুঃখের বিষয়, স্বাস্থ্যসেবার সমাধানের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয় বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিদের পরিবেশ দূষণের প্রতি সংবেদনশীলতার অভাব, গ্রিনহাউজ গ্যাস ই-মিশন ইত্যাদি আরো কত বিপদ নিয়ে আসবে পৃথিবীর মানুষের জন্য! এই সমস্ত অবিচার এবং বৈষম্যের মাঝে বিশ্ব অর্থনীতিকে সাক্ষী হতে থাকবে বাণিজ্য এবং মুদ্রা যুদ্ধের।
বড় বড় দানব কোম্পানিণ্ডলি অসহায় ছোট কোম্পনিণ্ডলোকে গ্রাস করার চেষ্টা করবে। এদিকে, যুক্ত রাজ্যের ইইউ তালাক, ইইউর আভ্যন্তরীণ সঙ্কট, ন্যাটো সংস্থার অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভবিষ্যৎ, সাইবার-সিকিউরিটি আক্রমণ, বিশ্বব্যাপী সাধারণ ক্রেতাদের হতাশা এবং বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাহীন লোভ লালসা অব্যাহত থাকবে।
ইতিমধ্যে, বিশ্বের ঋণের পেঁচাল যা বছরের শেষে ২৬০ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে যা বৈশ্বিক জাতীয় আয়ের তিনণ্ডণ, এসব অর্থনীতিবিদদের পর্যালোচনায় এজেন্ডা আইটেমণ্ডলির মধ্যে অবিরত থাকবে!
শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন যে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশণ্ডলি যদি স্বল্প-মেয়াদী পাবলিক ফিনান্স, অর্থাত্ বাজেটের ব্যবস্থা এবং সম্প্রসারণ মুদ্রা নীতিণ্ডলির সাথে বিশ্বব্যবস্থার সমস্যাণ্ডলি স্থগিত করার চেষ্টা করে, অন্য কথায় আগামী দিনের সুরক্ষার জন্য অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে,আগামী কয়েক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতি আরও বৃহত্তর সমস্যায় পড়বে।
২০২০ সালের আরেকটি উদ্বেগ হ’ল বৈশ্বিক বাণিজ্য ও মুদ্রা বিনিময় যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তার উদ্বেগে অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি প্রতিরোধ করা কঠিন হবে।
২০২০ সালে সবাইকে বিশ্বব্যাপী পণ্যের দাম, বিশেষত তেল এবং সোনার দাম সাবধানতার সাথে পর্যবেক্ষণ করার দরকার হবে।
অদূর ও সুদূর ভবিষ্যৎ কি হতে যাচ্ছে ভবিষ্যতে বা সুদূর ভবিষ্যতে তা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। অবশ্যই আসন্ন বছরণ্ডলি আগামী দশকের জন্য মূল ভিত্তি হবে। যেখানে শিল্প, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং পরিবহন ক্ষেত্রে দেশণ্ডলি একে অপরের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় আছে তারা আরো সে দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হবে। আমরা ইতিমধ্যে ২০১৯ সালে এর লক্ষণণ্ডলি পর্যবেক্ষণ করেছি। সর্বশেষ সম্প্রসারটি ছিল রাশিয়া ও জার্মানির মধ্যে উত্তর স্ট্রিম -২ প্রকল্পের সাথে জড়িত সংস্থাণ্ডলির উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা নেওয়ার সিদ্ধান্ত,যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদনের সময় কার্যকর করেছিলেন।
জার্মানি এই পদক্ষেপটি তার দেশের এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তীব্র হস্তক্ষেপ হিসাবে দেখেছিল।
অন্যদিকে, মার্কিন পক্ষ পরিষ্কারভাবে এই বার্তাটি জানিয়ে দিয়েছিল যে তারা ইউরোপকে আমেরিকার জ্বালানী শক্তি সম্পদের বৃহত্তম গ্রাহক হিসাবে পেতে চায় সে জন্য সেখানে জ্বালানি রফতানি বাড়াতে চায়। আমেরিকা মূলত ইউরোপকে রাশিয়া এবং ইরান থেকে জ্বালানী তথা তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস না কিনে আমেরিকার কাছ থেকে কিনতে চায়। নিঃসন্দেহে এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি লক্ষ্য তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি থেকে অর্জিত রাশিয়ার রফতানি আয় হ্রাস করা যাতে তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল করা যায়। কারণ,রাশিয়া, জ্বালানি রফতানি দিয়ে তাদের বিদেশী বাণিজ্য উদ্বৃত্ত (ভড়ৎবরমহ ঃৎধফব ংঁৎঢ়ষঁং) রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
তাই তারা প্রতিরক্ষার উন্নয়নে ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে নতুন পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হচ্ছে এবং তাদের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার সাথে সাথে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বৃদ্ধির সাথে বৈশ্বিক লেনদেনের হেরফের এবং আক্রমণণ্ডলির মোকাবেলায় তাদের মুদ্রা মূল্য এবং অর্থনীতি রক্ষা করতে পারে।
এখানে প্রশ্ন হতে পারে তবে, আমেরিকা ও রাশিয়ার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সিরিয়া, ইরাক, এমনকি লিবিয়া এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগর এলাকায় বিরোধে জাগিয়ে রাখার আগ্রহের পিছনে কি স্বার্থ রয়েছে?
বিপরীতক্রমে, এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওভারল্যাপ করে উভয়ের মাঝে!
মধ্যপ্রাচ্যকে যত বেশি আঞ্চলিক সমস্যা ও বিশৃঙ্খলা এবং যুদ্ধে টেনে আনা যাবে বা পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অন্চলে তীব্র উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার সম্মুখীন করা হবে,তাতে এই অঞ্চলের দেশণ্ডলিকে ইউরোপের বাজারে তাদের জ্বালানী সম্পদের বিক্রি থেকে উপার্জনে বিলম্বিত করা যাবে,ততই মার্কিন ও রাশিয়ার উভয়ের পক্ষে তত ভাল।
সুতরাং, এখানে তুরস্ক একটি অর্থবহ এবং মূল্যবান উদ্যোগ গ্রহণ করেছে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে বিশেষত সিরিয়া ও ইরাকের সুরক্ষা এবং লিবিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য যে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে যা প্রশংসার দাবী রাখে। তুরস্ক এখন ইরাক, লেবানন, জর্ডান, প্যালেস্তাইন, ইস্রায়েল এবং এমনকি মিশরকেও প্রস্তাব দিচ্ছে ইউরোপের জ্বালানী শক্তির বাজারের চাহিদা মেটাতে একসাথে কাজ করতে।
অন্যদিকে গ্রিস এবং গ্রীক সাইপ্রিয়ট প্রশাসন ইস্রায়েলের পক্ষ নিয়ে তুরস্ককে পাশ কাটিয়ে বা বাইপাস করে ইউরোপের জ্বালানী শক্তির চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন উপায় অব্যাহত রেখেছে।
তবে লিবিয়া ও তুরস্কের মধ্যে যে ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছে তা কেবলমাত্র আঞ্চলিক জ্বালানী সম্পদের বিক্রির রাস্তা নয় সেটি বরং আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক পরিবহন ব্যবসা চলাচলের রাস্তা খোলার ক্ষেত্রেও ণ্ডরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে।
যদি এ চুক্তি সত্যিকার অর্থে কামিয়াব হয় তাহলে যতই আগামী দশকের সময় অতিক্রম হতে থাকবে ততই আমরা সর্বদা এই “ভূ-কৌশলগত” এবং কূটনৈতিক পদক্ষেপের ণ্ডরুত্বটি স্মরণ করব বলে বিশেষজ্ঞমহল মনে করছেন।
তবে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের রাষ্ট্রণ্ডলি যদি তুরস্কের সাথে মিলে মিশে এগিয়ে আসতে পারত তাহলে ২০২০ সাল সত্যিই এক অভিনব আশার আলো দেখা দিত এ অন্চলের মানুষের ভাগ্যে। শুধু তাই নয় বিদেশী পরা শক্তি যে ভাবে সে অন্চলকে চরম উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশে জড়িয়ে দিয়েছে তা বিদায় নিত।