সবুজ পাসপোর্টকে পৃথিবীর বুকে সম্মানীত করেছেন স্যার আবেদ

আরিফ আহমেদ

আমরা কখনও কোন সরকারের জন্য কাজ করিনি, আমরা সব সময় বাংলাদেশের মানুষের জন্য কাজ করেছি’।- স্যার ফজলে হাসান আবেদ
এমন অসাধারণ উক্তিকারি ব্যক্তির সঙ্গে ১৯৮১ সালের জুন মাসে আমার সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়েছিল। তখনও আমার স্কুলের গন্ডি পার হয়নি। কিশোর বয়সে মিরপুর পল্লবী থেকে নৌকায় করে রাজেন্দ্রপুরে ব্রাক অফিসে গিয়েছিলাম। তখন বর্ষাকালে নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোন ব্যবস্থা ছিল না। আমার মামা সাব্বির আহমেদ চৌধুরী তখন ব্রাকে কাজ করতেন। এজন্য মামার সুবাদে স্বপ্নদ্রষ্টা ফজলে হাসান আবেদকে অনেকবার দেখার সুযোগ হয়েছে। আমরা সব সময় আবেদ সাহেবকে আবেদ মামা হিসেবে সন্মোধন করতাম। এই অসাধারণ মানুষটি গত শুক্রবার রাত আটটা ২৮ মিনিটে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। ৮৩ বছর বয়সের আবেদ সাহেব অনেক দিন ধরে মস্তিষ্কের এক ক্ষতিকারক টিউমারের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। এখন বনানী কবরস্থানে স্ত্রী আয়েশা হাসান আবেদের কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত তিনি। দীর্ঘ ৪৭ বছর পর ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে তিনি ব্রাকের চেয়ারম্যান পদ থেকে সড়ে দাড়ান। তবে তিনি প্রতিষ্ঠানের ইমিরেটাস চেয়ার ছিলেন। স্যার আবেদ ১৯৩৫ সালে সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হবিগঞ্জের সরকারি স্কুলে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। তাঁর বাবা প্যারালাইজড হলে তিনি তাঁর চাচার সঙ্গে পাবনায় চলে আসেন। তাঁর চাচা ছিলেন জেলা জজ। পাবনা জেলা স্কুল থেকে পাশ করার পর ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে তিনি স্কটল্যান্ডে নেভাল আর্কিটেকচারে ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে লন্ডন থাকাকালে তাঁর মা মৃতুবরণ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি লন্ডনে চাকুরি করেন। এপর কানাডা চাকুরি করেন।

সাব্বির আহমেদ চৌধুরী এবং স্যার ফজলে হাসান আবেদ

১৯৬৮ সালে ঢাকায় গিয়ে তিনি অয়েল কোম্পানি ‘শেল’ এ যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের ১৩ ই নভেম্বর ভোলায় প্রলয়ঙ্কারি ঘূর্ণিঝড়ের সময় তিনি ‘হেল্প’ নামে এক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
এ সংগঠনের মাধ্যমে তিনি মনপুরা দ্বীপে বিপুল সংখ্যক মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করেন এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে লন্ডন থেকে তিনি যুদ্ধের পক্ষে সমর্থণ আদায় করেন। স্বাধীন বাংলাদেশ ফিরে রাস্তাঘাট, সেতু ও ঘরবাড়ির অবস্থা দেখে তাঁর মন বিষন্ন হয়ে যায়। তখন স্যার আবেদের ভাবনায় জন্ম নেয়, নতুন সরকারের পক্ষে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সব কাজ করা কষ্টকর ও সময়সাপেক্ষ। এজন্য তিনি সাহায্যের জন্য সুনামগঞ্জের শাল্লা থানা বেছে নেন। এ গ্রামের প্রায় সবাই ছিলেন হিন্দু ধর্মের। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই খারাপ। শাল্লার সবাই যুদ্ধের সময় ভারত চলে যায়।
যুদ্ধ শেষে যখন তারা দেশে ফিরে আসে তখন তাদের ঘরবাড়ি ছিল ভাঙ্গাচোড়া। গরু-ছাগল, হাস-মুরগি কিছুই ছিল না। এসব কারনে গ্রামের লোকজন ছিলেন হতাশাগ্রস্ত। প্রথমে তিনি সুনামগঞ্জের ২০০টি গ্রাম নিয়ে এ প্রকল্প শুরু করেন। লন্ডনের বাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে স্যার আবেদ কাজ শুরু করেন। কর্মী হিসেবে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়োগ করেন। এরপর জরিপ কার্যক্রম শুরু করেন। শাল্লা গ্রামের বাসিন্দাদের বেশিরভাগই জেলে।
এজন্য জাপান থেকে মাছ ধরার লাইলন জাল নিয়ে আসেন। জেলেদের নৌকা বানাতে আসাম থেকে কাঠ আমদানি করেন। ঘর বানাতে কুশিয়ারা নদী পাড়ি দিয়ে ২২ লাখ বাঁশ আনেন। এরপর ধনী-গরীব, হিন্দু-মুসলমান সবার জন্য একই ধরনের ঘর বানিয়ে দেন। প্রথম দুই মাস নিজের টাকা দিয়ে এসব কাজ করেন। এরপর অক্সফামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁরা এসে জরিপের ভিত্তিতে প্রকল্প দেখার পর দুই লাখ পাউন্ডের ফান্ডের অনুমতি দেয়। সেই টাকা পাওয়ার পর আরও ১০ মাস পর্যন্ত এ প্রকল্প চালিয়ে নেন স্যার আবেদ। সুনামগঞ্জের প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পর তিনি চিন্তা করেন লন্ডন গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন। কিন্তু দেশের গরীব-দুঃখী মানুষকে ছেড়ে যেতে তার মন সায় দিল না। এ চিন্তা থেকেই ১৯৭২ সালে অসহায়, দরিদ্র এবং সর্বহারা মানুষের পুনর্বাসনের জন্য সাত সদস্য বিশিষ্ট ব্রাকের গভর্নিং বডি প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রতিষ্ঠাকালীন গভর্নিং বডিতে ছিলেন- কবি বেগম সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক আব্দুল রাজ্জাক, কাজী ফজলুর রহমান, আকবর কবীর, ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী, এম.আর হোসেন এবং স্যার আবেদ নিজে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বের ১২ টি দেশে এক লাখেরও বেশি কর্মচারি। ১৩ কোটিরও বেশি মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি তাঁর সব কাজকে গবেষণা দিয়ে প্রমাণ করতেন।
৮০’র দশকে ওরস্যালাইন-এর মাধ্যমে ব্রাক সবার কাছে পরিচিতি পায়। প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ নারীকে শেখানো হয়েছে কিভাবে এই স্যালাইন ব্যবহার করতে হবে। এর মাধ্যমে দেশে শিশু মৃত্যুহার অনেকাংশে কমে আসে।
তিনি সব সময় বলতেন, শুধু শিখালেই হবে না সঠিকভাবে ব্যবহার করছে কিনা তারও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
এ কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে ১০ বছর সময় লেগেছে। আশির পর নব্বই দশকে তিনি দারিদ্র বিমোচনের কর্মসূচি হাতে নেন। এ কর্মসূচি তিনি নারীদের দিয়েই শুরু করেন।
বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে স্যার আবেদ দেখেন, নারীরা সুশৃঙ্খল এবং সচেতন। তাই দারিদ্রতা আসলে নারীদেরই সেটা সফলভাবে মোকাবেলা করতে হয়। ব্যক্তি জীবনে আবেদ অমায়িক, বন্ধুবৎসল ছিলেন। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। ওপারে ভাল থাকবেন আবেদ মামা।