উনিশের যত গল্প

লিখেছেন ইশতিয়াক আহমেদ

প্রতিটি বছর শুরুতে নতুন বছরকে বিদেশ থেকে দেশে আসা আত্মীয়ের মতো মনে হয়। মনে হয়, আত্মীয়ের মতো এ বছরটা আমার জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসছে। এবং যা ঘটে সেটা আত্মীয়ের মতোই। একটা বিশেষ ব্র্যান্ডের সাবান ছাড়া যেমন কিছু নিয়ে আসে না আত্মীয়টি, তেমনি একটা-দুটা ছোট সুসংবাদ ছাড়া নতুন বছরও বিশেষ কিছু আনে না।

প্রতি বছরের মতো ২০১৯ও বিদেশ ফেরত মামা, চাচা বা আত্মীয়ের বেশে এসেছিল। ভেবেছি কী ম্যাজিক বক্স নিয়ে এসেছে জীবন রাঙিয়ে দিতে। ফল শূন্য লাউ আর কদুর হিসেবের বাইরে যায়নি কিছুই।

বছরের শুরুতে আওয়ামী লীগের সরকার গঠন ছিল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তেমনিভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আলোচিত ছিল সংরক্ষিত মহিলা আসন নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা। নানা

জল্পনা-কল্পনার সেই ঘটনা নিয়ে যা হয়েছিল তা মূল নির্বাচন নিয়েও হয়নি।

বিষয়টা আমার কাছে লেগেছে প্রাইমারি স্কুলে পড়াকালীন আমার বোনের আর্ট পরীক্ষার মতো। বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি পরীক্ষায় তার কোনো আওয়াজ ছিল না, কিন্তু আর্ট পরীক্ষার আগের দিন খাতা, কলম, রং পেনসিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে এমন একটা চেহারা করে রাখত মনে হতো বিসিএস দিচ্ছে।

তবে জীবনটাই এমন এক পরীক্ষা যাতে বিসিএসের প্রেসার সামান্য। যেখানে ১৯-এর ফেব্রুয়ারি মাসেই নেমে এসেছিল চকবাজারে আগুন। ছিনতাই হয়ে উড়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ বিমানের ময়ূরপঙ্খী নামক এয়ারবাস। আগের দিনে রাজপুত্ররা সেই হিসেবে বড় বাঁচা বেঁচে গেছেন তাদের ময়ূরপঙ্খী বাহন কখনও ছিনতাইয়ের কবলে পড়েনি। কত রাজা তা হলে পুত্রহারা হতেন। ঢুকে পড়তেন স্বজনহারাদের ইতিহাসে।

এর মধ্যে মার্চে এসে ঢুকে পড়ে ১৯এ। সেই মার্চে পিস্তল নিয়ে বিমানে ঢুকে পড়লেন ইলিয়াস কাঞ্চন, ধানের শীষ নিয়ে সংসদে সুলতান মনসুর। আর ডাকসু ভবনে ঢুকল নির্বাচনের আলো। সেই আলোতে আলোকিত হলেন নুর। হাসলেন বিজয়ের হাসি। নুরের সঙ্গে হাসল দেশের অনেক মানুষও।

তবে এর মাঝে এপ্রিল এসে কাঁদিয়ে দিল আমাদের। নুসরাত জাহান রাফির হত্যা আমাদের কাঁপিয়ে দিল প্রচ- যন্ত্রণায়। এত বড় ঘটনা যে দেশে ঘটে সে দেশে তুচ্ছ বিষয় নিয়েও তোলপাড় চলে। রংপুরে বিয়েবাড়ির খাবারে লবণ কম হওয়ায় মারামারি করেছে লোকজন।

এ জাতির বিনোদনের অভাব হয়নি কখনও হবেও না। যাই হোক, এ দেশে অনেক বড় ঘটনাও ছিল। এপ্রিলেই এসেছিলেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। যিনি বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনা করে গিয়েছিলেন।

এটা দেখে এক ছোট ভাই বেশ উত্তেজনা নিয়ে বলল, ভাই, দেখেছেন বাংলাদেশে ডাক্তারি পড়ে গিয়ে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছে?

আমি নির্লিপ্ত ভাব নিয়ে বললাম, এতে এত উত্তেজনার কী আছে? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাই এমন, যে যেই সাবজেক্টে পড়ে ওই রিলেটেড পেশায় টিকতে পারে না কখনওই।

তবে মূল্যায়ন না থাকলে এ দেশে অনেক কিছুর মূল্য ছিল এ বছর। যা মে মাসে উন্মোচিত হয়েছিল দেশে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্রিনসিটি আবাসন প্রকল্পে একটা বালিশ কিনতে খরচ হয়েছিল পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা। আর ভবনে বালিশ ওঠাতে ৭৬০ টাকা।

কী আজব।

তবে এ বছর সবচেয়ে আজব ছিল চাঁদের লুকোচুরি। ওঠে না ওঠে না করে নির্দিষ্ট সময়েরও বেশ খানিকক্ষণ পর কোথা থেকে হাজির হয়েছিল ঈদের চাঁদ। ঘটনা জুনের।

এসব নিয়ে বলার কিছু ছিল না। বিচার দেওয়ারও জায়গা ছিল না কোথাও। বিচার দেওয়ার জন্য প্রিয়া সাহার মতো মেধাবী হতে হয়। তিনি বিচার দিতে ট্রাম্পের কাছে হাজির হয়েছিলেন জুলাইতে।

কী বিস্ময়কর নারী। ভয়ে চুপসে গিয়েছিলাম আমরা।

আমরা যেহেতু যে কোনো কিছু হেসে উড়িয়ে দিতে জানি, এটাও দিয়েছিলাম। হাসির রোগও এ বছর পেয়ে বসেছিল আমাদের। জুলাইতেই ঘটেছিল এক হাসির ঘটনা। যা কিছুটা বেদনাদায়কও।

কুমিল্লায় হাসতে হাসতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল ২৫ শিক্ষার্থী। সৈয়দপুর উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণির মেয়েদের ক্লাসে পড়াচ্ছিলেন শিক্ষক সুধাংশু ভূষণ দাস। হঠাৎ শ্রেণিকক্ষে দুই-তিনজন শিক্ষার্থী হাসাহাসি শুরু করে। শ্রেণি শিক্ষক হাসির কারণ জানতে চাইলে, অন্যরাও হাসি শুরু করে। ফল অজ্ঞান। তবে কী ঘটেছিল জানি না, হয়তো সিটি করপোরেশনের আইনজীবীর মতো মজার কথা বলেছিল কেউ। আদালতে সিটি করপোরেশনের আইনজীবী বলেছিলেন, উত্তরে ওষুধ দিলে মশা দক্ষিণে যায়, দক্ষিণে দিলে উত্তরে যায়।

আমার প্রশ্ন ছিল, তিনি এ মশাগুলো শনাক্ত করেছেন কীভাবে? উত্তর দক্ষিণের মশার কি আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য আছে?

অথবা তিনি আমার পরিচিত মহাজ্ঞানী সেই লোকের মতো যিনি, অফিসে গিয়ে হতাশার সুরে তার কলিগকে বলেছেন, কাল আমার বাসার তেলাপোকারা পাশের ফ্ল্যাটের তেলাপোকাদের সঙ্গে যুদ্ধে জিতেছে।

কলিগ আনন্দ নিয়ে বললেন, বাহ। খুবই সুসংবাদ। কিন্তু আপনার মন খারাপ কেন?

তিনি আরও বিষণœ হয়ে বললেন, যুদ্ধে জিতে সঙ্গে করে আরও ৫০০ যুদ্ধবন্দি নিয়ে এসেছে।

আগস্টজুড়ে আমাদের এমনি ব্যাপকভাবে বন্দি করেছিল অ্যাডিস মশা। ডেঙ্গুর প্রকোপে আমরা মোটামুটি মশারিবন্দি অবস্থা। আর মশার ভয়ে দুই মেয়র এ ঘাটে জল পান করেন। আর আমাদের ভেতর পানিশূন্য।

সমালোচনার আগুন লাগল ঢাকার মিডিয়ায়। যে আগুন একই সময়ে লাগা অ্যামাজন বনের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।

অ্যামাজনের ভেতরে যে অবস্থা ছিল তা আমাদের জানার কথা ছিল না। কিন্তু মতিঝিলে কী ছিল তা জানার কথা ছিল অবশ্যই। কিন্তু দীর্ঘসময় তাও জানতে পারিনি। আমাদের অলক্ষে মতিঝিল হয়ে গিয়েছিল ক্যাসিনোর অ্যামাজন। এত ক্যাসিনো বুকে করে ছিল মতিঝিল ভাবতেও পারেনি কেউ। প্রকাশ পেয়েছিল সেপ্টেম্বরে। কোনো সিসিটিভিও ধরতে পারেনি সেসব দৃশ্য।

সিসিটিভি অক্টোবরে এসে ধরিয়ে দিল আবরার ফাহাদ হত্যাকারীদের। বেদনাদায়ক সেই ঘটনায় আমাদের পাশে সিসিটিভি না থাকলে জানা যেত না অনেক মুখের আড়ালে মুখোশের মানুষ। যারা মেধাবী ছাত্র বলে পরিচিত। অনেক পরিচিতই আসলেই পাল্টে যায় সময়ের ব্যবধানে। যেমন, পেঁয়াজ। সাধারণই ছিল। হঠাৎ হয়ে গেল মহামূল্যবান। পেয়াজের উন্নতি আর বুয়েটের ছাত্রদের অবনতি দুই ছিল অবিশ^াস্য।

ডিসেম্বরে এসেও অনেক কিছু হয়ে গেলে। ঘটল অনেক ঘটনা। বছরের শেষে এসে অনেকেই হেসেছেন। কেউ আওয়ামী লীগের কমিটিতে স্থান পেয়ে, কেউ প্রমোশন পেয়ে। শুধু কেঁদেছিলেন ঢাকা দক্ষিণের সদ্যবিদায়ী মেয়র সাঈদ খোকন।

মশার কামড় থেকে রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে নিজেকেও রক্ষা করতে পারলেন না তিনি।

এত এত ঘটনা, দুর্ঘটনার দেশ নিয়ে আমরা কোথায় যাব?

হতাশ হই।

মন খারাপ হয়।

আবার আশায় বুক বাধি।

আমি বিশ্বাস করতে চাই, একদিন এ দেশের মানুষ পুরোপুরি সুন্দর হবে। একদিন এ দেশের সব গাড়িতে হর্নের বদলে বাজবে রবীন্দ্রসংগীত। একদিন এ দেশে এমন রাত আসবে যখন গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে সবাইকে হেডফোন দেওয়া হবে। আমি বিশ্বাস করি, একদিন এ দেশে মানুষ পুরোপুরি সুন্দর হবেই। সেদিন উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে আর জনসভা হবে না। ঘরে বসে মেইলে পেয়ে যাব প্রধান অতিথির বক্তব্য।

আমরাও শব্দছাড়া হাত তালি বাজিয়ে জানিয়ে দেব, সুন্দর বলেছেন মাননীয়।