ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপড়েন!

ভারত এবং বাংলাদেশের মাঝে আসলে কি হচ্ছে তা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের এক শ্রেণীর রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধোঁয়াশার অবস্থায় আছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি একাধিকবার শীতল অভ্যর্থনা, একের পর এক মন্ত্রী পর্যায় বা সচিব পর্যায়ের বৈঠক বাতিল- এগুলোর কোনো পরিস্কার ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে তা মোটেই যথেষ্ট নয়। বিগত ১০ বছর ধরে প্রায় সব কিছু দিয়ে বাংলাদেশ ভারতকে যেভাবে খুশি করেছে তারপর বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দের প্রতি এই ধরণের উপেক্ষার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়না। অনেক সময় একটি দেশ যখন আন্তর্জাতিক বিধির পরিবর্তন করে তখন সম্পর্কে শীতলতা বা উষ্ণতা দেখা যায়। পৃথিবীর এক নং এবং একমাত্র পরাশক্তি আমেরিকা বাংলাদেশের প্রতি সন্তুষ্ট নয়, সে কথা যখন হিলারী ক্লিন্টন আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন থেকেই মানুষ জানে। সেটা জানা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছিলো। তার কারণ, বাংলাদেশ ভারতীয় বলয়ে থাকুক, সেটা আমেরিকা মেনে নিয়েছিলো। কারণটা সকলেই জানেন। সেটি হলো ‘চীন ফ্যাক্টর’। আটলান্টিকের ওপারে থেকে অর্থাৎ সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার থেকে এসে আমেরকিার পক্ষে চীনকে কনটেইন করা অসম্ভব না হলেও বেশ কষ্টকর ব্যাপার, এটা সকলেই বুঝবেন। তাই আমেরিকার কৌশল ছিলো, ভারতকে সামরিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী করে চীনের বিরুদ্ধে বুলওয়ার্ক হিসাবে ব্যবহার করা।

বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদ পর্যন্ত আমেরিকার ঐ স্ট্র্যাটেজি ঠিকঠাক মতোই চলছিলো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেলায় আমেরিকার ঐ পলিসিতে টান পড়ে। এর জন্য ভারত দায়ী। কারণ, ভারত ‘গাছেরটাও খাবো, আবার তলারটাও কুড়াবো’ এই নীতি শুরু থেকেই অনুসরণ করে আসছিলো। আমেরিকা এবং ইসরাইলের সাথে হবনবিং করেও রাশিয়ার সাথে সর্বোচ্চ সামরিক সম্পর্ক ভারত চালিয়ে যাচ্ছিলো। অন্যদিকে চীনের সাথেও ভারত সম্পর্ক নষ্ট করতে রাজী নয়। বাংলাদেশের ব্যাপারে আমেরিকার নীতি ছিলো, ‘বাংলাদেশ কেয়ার অব ইন্ডিয়া।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন এই নীতি পুনর্বিবেচনা করেন। অভিজ্ঞ রাজনৈতিক মহলের মতে, যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় প্রভাববলয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে চীন যতটা এগিয়ে গেছে, আমেরিকা ততটা এগুতে পারেনি। তাই আমেরিকা এখন চাচ্ছে, বাংলাদেশের সাথে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলবে, ভায়া ইন্ডিয়া নয়।

কারণটা যাই হোক না কেন, আমেরিকার সাথে সম্পর্ক উন্নত করতে না পেরে বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট বেল্ট এ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে এগিয়ে চলেন। এই বেল্ট এ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশ যোগদান করলে অন্ততঃ ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাহায্যের আশ^াস পায়। একত্রে এরকম টোপ বাংলাদেশের সামনে বিগত ৪৭ বছরে আর আসেনি। বাংলাদেশ চীনের রোড ইনিশিয়েটিভে জয়েন করে। চীন ভারতকেও জয়েন করার আবেদন জানায়। কিন্তু এশিয়ায় তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের এই প্রকল্পে যোগদান করতে ভারত অস্বীকৃতি জানায়। বিশেষ সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, বাংলাদেশ এই প্রকল্পে যোগদানের জন্য ভারতকে অনুরোধ করে।

॥দুই॥

বাংলাদেশ তার সামরিক বাহিনী শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর তিন পক্ষের মধ্যে নৌবাহিনী ছিলো সবচেয়ে দুর্বল। এদিকে লক্ষ্য রেখে বাংলাদেশ চীন থেকে দুইটি সাবমেরিন ক্রয় করে। সামরিক এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, চীনের নিকট থেকে সাবমেরিন ক্রয় ভারত ভালো চোখে দেখেনি। এটি যে বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্ব বুঝতে পারেনি তা নয়। সুতরাং এক্ষেত্রে বাংলাদেশ চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়। এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ, যেটি বাংলাদেশ সাফল্যের সাথে করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। ভারত বাংলাদেশে এমন একটি সরকার চায়, যে সরকার ডাইনে, বাঁয়ে তাকাবে, সেটা ভারত বরদাস্ত করতে রাজী নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতের ভৌগোলিক সংহতির জন্য যে কাজ করেছে, পূর্ববর্তী ৩০ বছরে কোনো দেশ বা সরকার সেটা করেনি। উত্তর-পূর্ব ভারতের ৭টি রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে, বছরের পর বছর ধরে চলেছে বিচ্ছিন্নতা বা স্বাধীনতার সংগ্রাম। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় সেই বিচ্ছিন্নতাব বা স্বাধীনতার সংগ্রাম ভারত দমন করেছে। ফলে ভারত উত্তর পূর্ব ভারতে ইতোপূর্বে যে ৪ লক্ষ সৈন্য মোতায়েন রাখতো সেটা আর রাখতে হচ্ছে না। এই ৪ লক্ষ সৈন্যকে ভারত চীন ও পাকিস্তান সীমান্তে মোতায়েন করেছে। এছাড়া ভারত ৬০ বছর ধরে প্রথমে পাকিস্তান সরকার এবং পরে বাংলাদেশ সরকারকে উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রানজিট বা করিডোর এবং চট্টগ্রাম এবং মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করার অনুরোধ করে আসছিলো। কেউ ভারতের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। কিন্তু বর্তমান সরকার ট্রানজিট এবং বন্দর দুটোই ভারতকে দিয়েছে। ফলে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব এবং খরচ দুই তৃতীয়াংশে কমে গেছে।

॥তিন॥

এত কিছু পেয়েও ভারত সন্তুষ্ট নয়। সে চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার যেন সম্পূর্ণভাবে ভারতের করতলগত থাকে। তাই বাংলাদেশ যখন চীনের দিকে তাকায় তখন ভারত নাখোশ হয়। এগুলো তো ছিলো ভারতের অসন্তুষ্টির পয়েন্ট। কিন্তু ভারত যখন গত কয়েকমাস ধরে নাগরিক পঞ্জি নিয়ে এগিয়ে গেছে এবং সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাশ করেছে তখন সেই দুইটি পদক্ষেপ বাংলাদেশকে এ্যাফেক্ট করেছে। কূটনৈতিক সূত্র মোতাবেক, গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন হয় তখন সেই অধিবেশনের সাইড্ লাইনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নাকি বাংলাদেশের অসন্তোষ ভারতকে জানিয়ে দেন। এর পরিণতিক কী হয়েছে, সেটি সঠিক জানা যায়নি। কিন্তু গত অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী যখন ভারত সফরে যান তখন তাঁকে বিমান বন্দরে প্রধানমন্ত্রীতো দূরের কথা, কোনো ক্যাবিনেট মন্ত্রীও রিসিভ করেননি। তৎসত্ত্বেও পর্যবেক্ষক মহলের মতে, ভারতের অসন্তোষ দূর করার জন্য বঙ্গোপসাগরে নজরদারী করার জন্য বাংলাদেশ সরকার ভারতকে ২০টি রাডার বসানোর অনুমতি দেয় এবং ত্রিপুরার মানুষের সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য ফেনী নদী থেকে পানি উত্তোলনের অনুমতি দেয়।

এরপরেও বাংলাদেশ ভারতের মন গলাতে পারেনি। তাই সম্প্রতি কলকাতায় অনুষ্ঠিত টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচ দেখার জন্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন কলকাতা যান তখন শুধুমাত্র ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলি তাকে বিমান বন্দরে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। ভারতের কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, এমনকি পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও তাকে বিমান বন্দরে রিসিভ করেননি।

॥চার॥

এই পটভূমিতে পর্যবেক্ষক মহল বিচার করছেন বাংলাদেশের দুইজন মন্ত্রী এবং একজন সচিবের ভারত সফর বাতিলকে। চলতি মাসেই ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত ভারত মহাসাগরীয় সন্মেলনে যোগদানের কথা ছিলো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এই সফর বাতিল হয়। সফর বাতিলের কারণ হিসাবে বলা হয় যে, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস এবং ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ঐ সন্মেলনে যেতে পারছেন না। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শিলংয়ের একটি অনুষ্ঠানে যোগদানের কথা ছিলো। শিলংয়ের ঐ অনুষ্ঠানটি ছিলো বাংলাদেশের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা। শিলংয়ের মূখ্যমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ করেছিলেন।

এতগুলো ঘটনা ঘটার পর এমাসেই দেখা গেলো বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। বৈঠক বাতিলের কোনো কারণ দর্শানো হয়নি। শনিবার এই কলাম লেখার সময় একটি টেলিভিশন চ্যানেলে খবর দেখা গেলো যে, ২০ এবং ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলা-ভারত-নেপাল সচিব পর্যায়ের বৈঠকেও বাংলাদেশের মন্ত্রী যাচ্ছেন না। ফলে সেই বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার যতই বলুক, ভারত আশ^াস দিয়েছে যে, বাংলাদেশের চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নাই, তারপরেও দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশের ঝিনাইদহ সীমান্ত দিয়ে ২৫০ জন মুসলমান ভারত থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছিলো। তাদের ৫০ জনকে আটক করা হয়েছে। নাগরিক পঞ্জির অতিরিক্ত ২০ লক্ষ লোককে কি করবে ভারত? সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে বাংলাদেশকে। ওদের ভাষায়, বাংলাদেশ থেকে যেসব অনুপ্রবেশকারী(?) ভারতে প্রবেশ করেছে তাদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হবে। এই সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আগের মত আর মধুর বলে মনে হয় না।