চপল ভাইয়ের পাগলামি ও দশ সোনা

লিখেছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল; মানে চপল ভাই একটু পাগলাটে টাইপের লোকই হয়তো। বেশ শান্তিতে ছিলেন। হ্যান্ডবল ফেডারেশনের কর্মকর্তা হিসেবে বেশ ভালো করছিলেন। বয়স হয়েছে। লোকে সম্মান করতো। হঠাৎ মাথায় কী কাজ করলো। কোত্থেকে যেনো আর্চারির প্রেমে পড়ে গেলেন। ঠিক করলেন, বাংলাদেশে আর্চারি শুরু করতে হবে!

আমি তখন প্রথম আলোতে। তখনও ক্রিকেট সাংবাদিকতা শুরু করিনি। শুভ্রদার (উৎপল শুভ্র) নির্দেশ, আগে ক্রিকেট-ফুটবল ছাড়া বাকী খেলাগুলো বোঝা শুরু করো, এগুলো কাভার করো; তারপর আসবে ক্রিকেট বা ফুটবলে। আমি রোজ বক্সিং, কাবাডি, ভারোত্তলন, দাবা; এসব ফেডারেশনে ঘুরি। নানা টাইপ গল্পের মতো লেখা লিখি। পবিত্রদা (পবিত্র কুন্ডু) সেগুলোকে আরও মানুষ করে তোলেন। একদিন পল্টনে দেখি, তীর ধনুক নিয়ে বেশ কয়েক জন খেলোয়াড় এবং একজন সাদা চুলের মানুষ কী সব কাণ্ড শুরু করেছেন। খোজ নিয়ে জানলাম, ওই সাদা চুলের লোকটা চপল ভাই। অফিসে এসে বলতে পবিত্রদা বললেন, ‘চপলকে চেনেন না? ও তো খেলা পাাগল।’

সেই চপল ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয়। উনি হয়তো আমাকে ভুলে গেছেন; গত এক যুগ দেখা-কথা নেই।  কিন্তু আমি এই ‘পাগল’ মানুষটাকে ভুলতে পারি না। চপল ভাই হ্যান্ডবলে ছিলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশে আনলেন খো খো খেলা। সেটাকে একটু দাড় করিয়ে আনলেন এই আর্চারি। শুরুতে তো আমাদের এখানে প্রতিযোগিতামূলক খেলার ধনুক, তীর ছিলো না। অতো কেনার টাকাও মনে হয় চপল ভাইয়ের ছিলো না। স্থানীয়ভাবে বাশ, কাঠ দিয়ে ধনুক বানিয়ে খেলা চালু করলেন তিনি।

রাজিব উদ্দিন আহমেদ চপল

কলকাতায় গিয়ে এখানে ওখানে, পথের পাশ থেকে কিছু উপকরণ কিনে কিনে আনলেন। আমি দিব্যি মনে করতে পারি, এই খেলাটায় একটু সাপোর্ট দেওয়ার জন্য চপল ভাই তখন সবার কাছে কাকুতি মিনতি করে বেড়াচ্ছেন। স্পন্সর পেতে হবে, একটু নিউজ করাতে হবে; সবকিছু করছেন নিজে দৌড়ে দৌড়ে। সত্যি বললে বলতে হয়, সে সময় চপল ভাইকে নিয়ে খুব হাসাহাসি হতো। অন্যান্য ফেডারেশনের কর্মকর্তারা তো বটেই, সাংবাদিকরাও বলতেন, ‘চপল একটা পাগলামি শুরু করেছে।’

চপল ভাইকে সন্দেহ করছে, এমন লোকও আমি দেখেছি। তার এই আর্চারি পাগলামির পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, এসব কথাও তখন বাজারে চালু ছিলো। চপল ভাই কিছুতে পাত্তা দেননি। তিনি ছোটাছুটি আর পরিশ্রম করে গেছেন। একে ওকে ধরে, নিজের পয়সা ব্যয় করে কিছু তীর-ধনুক, ইকুইপমেন্ট কেনেন।

একটু একটু করে আমরা তাজ্জব হই। একজন, দু জন করে আর্চার ছোট বড় সাফল্য পেতে শুরু করেন। আর সবচেয়ে বড় ঘটনাটা ঘটে, এই রুমান সানাদের আবির্ভাবে। রুমান খুলনার ছেলে। তিনি গুলতি মারতে মারতে আর্চারিতে এসেছেন। অসামান্য এই প্রতিভাধর ছেলেটি চপল ভাইয়ের স্বপ্নপূরণের বিরাট ভূমিকা রাখতে শুরু করে। সেই সাথে আরও কয়েক জন দারুন প্রতিভাধর আর্চারকে পেয়ে যান চপল ভাই।

এর মধ্যে বড় একটা ধন্যবাদ পাওনা আমাদের ক্রীড়ামন্ত্রী জাহিদ হাসান রাসেলের। এই ভদ্রলোক তখনও ক্রীড়ামন্ত্রী হননি। কিন্তু তিনি অনেককাল ধরেই দারুন ক্রীড়াপ্রেমী। চপল ভাইয়ের অনুরোধে রাসেল সাহেব আর্চারিতে টঙ্গীর আহসানউল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে সারা বছর নিবিঢ় অনুশীলনের সুযোগ করে দিলেন।

আর্চারির দলগত ইভেন্টে স্বর্ণজয়ী বাংলাদেশ দল

 

আস্থা বাড়তে থাকলো চপল ভাইয়ের ওপর। বিদেশী কোচ এলো, ট্রেনিং চললো সারা বছর। ফলও এলো। রোমান সানা দেশের ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় অ্যাথলেট হিসেবে অলিম্পিক কোয়ালিফাই করলেন; প্রথম ছিলেন গলফার সিদ্দিকুর রহমান। সেই রোমান সানারা এবার বাজিমাত করলেন নেপালে। পোখরায় অনুষ্ঠিত এসএ গেমসের আর্চারির ১০টি ইভেন্টে অংশ নিয়েছিলো বাংলাদেশ। একেবারে পারফেক্ট টেন ফল। সবগুলোতে সোনা জিতলো চপল ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা।

এবার স্বপ্নের পরিধিটা আরেকটু বড় করা যাক। আমি সবসময় বলি, ফুটবল, ক্রিকেটের মতো শারীরিক শক্তি ডিমান্ড করে, এমন খেলা দিয়ে আমরা বিশ্বজয় করতে পারবো না। বক্সিং, রেসলিং, ভারোত্তলন দিয়েও হবে না। আমাদের ফোকাস করতে হবে শুটিং, আর্চারি ও দাবায়।

দাবায় আমরা এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ড মাস্টার পেয়েছিলাম। সেই দাবায় আমরা কেনো পিছিয়ে পড়লাম? শুটিংয়ে আমরা কমনওয়েলথ সোনা জিতেছি। আসিফ যাকে হারিয়ে সোনা জিতেছিলেন, সেই অভিনব বিন্দ্রা পরে অলিম্পিক সোনা জিতেছেন। আসিফ কেনো পারেননি?

এসব প্রশ্ন ভেবে দেখতে হবে। সেই সাথে প্রতীজ্ঞা করতে হবে, রোমান সানা যেনো আসিফ আ নিয়াজ মোর্শেদের মতো এসে হারিয়ে না যান। রোমান সানাদের ধরে রাখতে হবে। আমাদের পূর্ন করতে হবে চপল ভাইয়ের স্বপ্ন। কে জানে, সেই বাশের ধনুক থেকেই অলিম্পিক পদক আসবে হয়তো!