সময়রেখা ::: চিঠি

লিখেছেন মাহমুদুল হাসান রুবেল

ফেব্রুয়ারি ৫, ১৯৮৭ :

জমির সাহেব মারা গেলেন আজ বিকেল তিনটায় । একমাত্র ছেলে রাহাতকে রেখে গিয়েছেন তিনি । মৃত্যুর সময় তার পাশে কেউ ছিল না । স্ত্রী মারা গেছেন আজ তিন বছর হলো । কাজের লোক দেখাশোনা করতো । রাহাত দেশে থাকে না । স্ত্রী সন্তানসহ যুক্তরাষ্ট্রে থাকে । পিতার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর দেশের পথে রওনা দেয় । কিন্তু মৃত্যুর তিন দিন পর । কোন এয়ার টিকেট পায়নি । তাই তার পিতার মুখ শেষ বারের মতো আর দেখতে পারেনি ।

ফেব্রুয়ারি ১৯, ১৯৮৭ :

রাহাত দেশে এসে তার পিতার কবরে এসে পাগলের মতো কাঁদে । তার আর কেউ থাকলো না বেঁচে । পিতার পৈতিক ভিটা-বাড়ি ছাড়া আর কিছু ছিল না । রাহাত তার স্ত্রীর পরামর্শে পিতার শেষ চিহ্ণটুকু বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যায় ।

মার্চ ২৫,১৯৮৭:

রাহাতের ঠিকানায় একটি চিঠি আসে । রাহাত চিঠি পড়ে ভেঙে পড়ে । চিঠিটা এরকম ছিল-

রাহাত বাবা,
বউ মা, নাতি-নাতনীকে নিয়ে আশা করি ভালই আছো । এদিকে আমি তেমন একটা ভালো নেই । বেশিদিন বাঁচবো না মনে হচ্ছে । প্রায়ই রাতে স্বপ্নে দেখি তোমার মা আমাকে ডাকছে । আমার তো কেউ নেই তুমি ছাড়া । তোমাকে এই চিঠি লেখার কারণ আছে অনেক । আমি সারা জীবন অনেক কষ্ট করে অনেক টাকা জমা করেছি । সব তোমার জন্য । আজ সময় হয়েছে সেই টাকা তুমি বুঝে নেয়ার । আমি যে খাটে ঘুমাই সে খাটের নিচে কার্পেট তুললে দেখবা যে জায়গাটা পাকা না মাটির সেটা খুঁড়লে একটা স্টিলের ট্রাংক পাবা । সেখানে তোমার জন্য ৩৫ লক্ষ টাকা আর কয়েকশত ভড়ি স্বর্ণ রেখে গেলাম ।

আমি তোমার জন্য কিছুই করতে পারিনি । সারা জীবন তুমি নিজে কষ্ট করে বড় হয়েছো । এটাই আমি চেয়েছিলাম । আমি চেয়েছিলাম তুমি নিজ যোগ্যতায় বড় হও । আর তুমি তা করতে পেরেছো । এটাই আমার আনন্দ । আমি এখন অনেক শান্তিতে মরতে পারবো । পারলে একটু তাড়াতাড়ি দেশে ফিরে আসো । আমাকে দেখে যাও এবং সবকিছু বুঝে নাও । আসার সময় আমার জন্য বিদেশি সিগারেট নিয়ে আসিও । সিগারেটের পা্ইপও । বিদেশি বড়শির আমার অনেক দিনের সখ । তোমার অপেক্ষায় থাকবো ।

ইতি তোমার পিতা

এপ্রিল ১৫, ১৯৮৭ :

রাহাত দেশে ফিরে যায় । কিন্তু যার কাছে জায়গা বিক্রি করে সে ছিল অনেক প্রভাবশালী । গ্রামের চেয়ারম্যান । রাহাত তার বাবার ভিটে বাড়ি আবার কিনতে চায় । কিন্তু চেয়ারম্যান বিক্রি করতে রাজী হয়নি । চেয়ারম্যান সহজেই বুঝতে পারে কোন ঘটনা আছে এর পিছনে । সমস্ত ঘর খোঁজাখুঁজির পর সেই ট্রাংকের সন্ধান পায় । তা নিয়ে নেয় সে । তারপর রাহাতের কাছে বিক্রি করতে সম্মত হয় বাড়িটি । রাহাত কিনে নেয়ার পর বুঝতে পারে তার বাবার সব সম্পত্তি চেয়ারম্যান নিয়ে গেছে । চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞেস করে । চেয়ারম্যান ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে । রাহাত মামলার কথা বলে । তার বাবার চিঠির কথা বলে ।

এপ্রিল ২০, ১৯৮৭ :

২০ এপ্রিল রাহাত মারা যায় সড়ক দূর্ঘটনায় । ট্রাক তার উপর দিয়ে চলে যায় ।