জানা শাম্মীর Untying the Knot

লিখেছেন মণিকা মুনা

রুমানা মঞ্জুরের কথা মনে আছে ? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় মাস্টার্স করতে এসেছিলেন; দেশে গিয়ে নিজের গবেষণা সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহকালে ঈর্ষা জর্জরিত স্বামীর সহিংস আক্রমণে হারিয়েছিলেন তাঁর দৃষ্টিশক্তি। আশা করবো আমরা সবাই তাঁকে মনে করতে পারছি। এই সিনেমার মূল গল্পটি রুমানা মঞ্জুরের গল্প। একটি এবিউসিভ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছে জানাতে স্বামীর সহিংস আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিষয়বস্তু রুমানা মঞ্জুরকে আশ্রয় করে শুরু হলেও ক্যানাডিয়ান বাংলাদেশী পরিচালক জানা শাম্মী মূল গল্পের শেকড় নিয়ে যান আমাদের সামাজিক অবকাঠামোর অনেক গভীরে। সেই অবকাঠামোটি কী ? নারীর প্রতি অসৌজন্য, অসহযোগিতা থেকে শুরু করে সহিংসতার মূল ভিত্তি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যাবস্থা। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী কতগুলো স্তরে শোষিত এবং অত্যাচারিত হতে পারে সেটি আমরা চারজন বাংলাদেশি নারীর জীবনের ঘটনাক্রম থেকে শুধু দেখি না, অনুধাবন করি এই ডকু- ফিচার ফিল্মে। এই জার্নিটা এতো সাবলীল যে আমাদের কেউ কেউ নিজের জীবনটাই একটুখানি ঘুরে আসি অনায়াসে।মানসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং শারিরীক- নারী নির্যাতনের প্রায় সবগুলো স্তর আমরা ছুঁয়ে আসি চারজন ভিন্ন ভিন্ন পেশা এবং সামাজিক অবস্থানে থাকা বাংলাদেশী নারীর গল্পের মধ্য দিয়ে। যে অবস্থানেই থাকুক একজন নারী-পুরুষ সেই অবস্থান থেকেই তার শরীর ও মনের ওপর কর্তৃত্ব করা নিজেদের অধিকার বলে বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসের চর্চাকে কোনো অন্যায় বলে মনে করে না।এই বিশ্বাসের অনুসঙ্গ হিসেবে একজন ডিভোর্সি মেয়েকে অনবরত বিয়ের চাপ দিতে থাকে তার পরিবার, একজন বিবাহিতা নারীর পেশা তথা কর্মক্ষেত্র নির্ধারণ করে তার স্বামী, একজন আত্মবিশ্বাসী- স্বাবলম্বী নারীকেও স্বামীকে অবহিত করতে হয় তার সারাদিনের রুটিন ( যেটা স্বামীর কাছে জানার তার দাবী নয়)। পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক ব্যাবস্থায় এই দৃশ্যপটগুলো স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়- নারীকে রক্ষা, পালন এবং শাসনের দায়িত্ব প্রশ্নাতীতভাবে পুরুষ গ্রহণ করে। শাসন অস্বীকার বা মানুষ হিসেবে নিজের অধিকার দাবী করতে গেলে সেখানে নারীকে রুমানা মঞ্জুরের মতো সহিংসতার শিকার হতে হয়। Untying the Knot সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মেয়েদের গল্প। বন্ধন ছিঁড়ে ফেলা ছাড়া কখনও কখনো যেখানে মুক্তির নিঃশ্বাস নেয়ার আর পথ থাকে না! Domestic violence নিয়ে এমন সুন্দর উপস্থাপনা নিয়ে এই ডকু ফিচার ফিল্মটি গত ২ নভেম্বর মন্ট্রিয়লে প্রদর্শিত হয় সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিবল অব মন্ট্রিয়লে এবং জিতে নেয় দর্শক পছন্দের ক্যাটাগরিতে সেরা ফিচার ফিল্মের। মন্ট্রিয়ল ছাড়াও এ ডকু ফিচার ফিল্মটি গত ৫ মে এডমন্টনে, ১৭ জুন টরন্টোতে, ২ আগষ্ট মিশিশাগাতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ফেস্টিবলে প্রদর্শিত হয়। আগামী ১৮ নভেম্বর নিউ দিল্লিতে ইন্ডিয়া হ্যাভিটেট সেন্টারে সন্ধ্যা সাতটায় প্রদর্শিত হবে। কানাডার সিবিসির ডকুমেন্টারি চ্যানেলে আগামী ২৪ নভেম্বর রাত ৯টায় সম্প্রচারিত হবে। একই চ্যানেলে ২৫ নভেম্বর পুনরায় সম্প্রচারিত হবে রাত তিনটায়। ২৬ নভেম্বর সকাল ১১টা, ৩টা, সন্ধ্যা ৭টায় এবং ১ ডিসেম্বর ভোর ৬টা, সকাল ১১টা ও বিকাল ৪টায় সম্প্রচারিত হবে। ডকু ফিচার ফিল্মটিতে চরিত্র রূপায়ন করেন রুমানা মঞ্জুর, লতিফা শারমিন, জান্নাতন নাঈমা, জেসমিন হক। এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার ললিতা কৃষ্ণা।