মাহে রবিউল আউয়াল ও আমাদের শিক্ষা

নুসরাত জাহান

হিজরি বছরের চাকা ঘুরে আবার আমাদের মাঝে উপস্থিত এখন রবিউল আওয়াল মাস। ইসলামি ইতিহাসে রবিউল আওয়াল গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য একটি মাস। ঐতিহাসিক মাস।

রবিউল আওয়াল মাসের চাঁদ আকাশে উঁকি দিতেই বিশ্বময় মুসলমানদের মাঝে নতুন করে এক আন্দোলন শুরু হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মহাব্বত নতুন করে জাগ্রত হয়। কারণ, অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতানুসারে এ মাসে সাইয়েদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন খাতামুন নাবীয়্যিন এ ধরাপৃষ্ঠে আগমন করেন, পবিত্র মক্কা থেকে মদিনা মুনাওয়ারা হিজরত করেন এ মাসে, আবার এ মাসেই তিনি আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত রিসালাতের সকল দায়িত্ব পালন শেষে স্বীয় প্রভুর আহবানে সাড়া দিয়ে পরলোক গমন করেন।

যখনই এ মাসের শুভগমন হয়, মুসলমানদের অন্তরে স্বাভাবিকভাবে নবী-প্রেমের নতুন হাওয়া জাগে, তারা নতুন করে আন্দোলিত হয়। যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মাঝে অনেক মতভেদ রয়েছে, যথাক্রমে : ১২, ৯, ৮ রবিউল আউয়াল। কিন্তু এ মাসের ১২ তারিখ সোমবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন, এ বিষয়ে কোনো মতানৈক্য নেই। (আস্ সীরাতুন্ নববিয়া লিমুহাম্মদ ইবনে ইসহাক্ব : ১৫৯,আল্লামা ইদ্রিস কান্দলভী : সীরাতে মুস্তাফা খন্ড : ১)।

মহানবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালবাসা ও তাঁর প্রদর্শিত পথ অনুযায়ী জীবন-যাপন করা ঈমানের অংশ। এ প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী (রহ.) তার কিতাবে স্বতন্ত্র একটি শিরোনাম এনেছেন, যার অর্থ ‘নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালবাসা ঈমানের অঙ্গ’। বিশিষ্ট সাহাবী আনাস (রা.) ও আবূহুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ওই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার নিকট নিজ পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষ হতে প্রিয় না হবো’। (বুখারী শরীফ : হা: ১৫, মুসলিম শরিফ: হা: ৪৫, মুসনাদে আহমদ: ১২৪৩)।

কোরআনে কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, হে নবী! আপনি বলুন, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা-মাতা, তোমদের সন্তান, তোমাদের ভাই-বোন, তোমদের পত্নি, তোমাদের বংশ, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের এমন ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমদের বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ কর; আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর রাহে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় না হয়, তাহলে অপেক্ষা কর- আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না। (সূরা তাওবা : ২৪)।

উল্লিখিত আয়াতে গোটা মুসলিম জাতির প্রতি এ আদেশ দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালবাসা এমন উন্নত স্তরে রাখা ওয়াজিব, যে স্তরে অন্য কারো ভালবাসা স্থান পাবে না। তাই যার ভালবাসা এ স্তরে নেই সে শাস্তির যোগ্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালবাসার অর্থ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সীরাত আলোচনা করা যেমন পূণ্যের কাজ তেমনিভাবে তার সূরত বা দৈহিক গঠন নিয়ে আলোচনা করাও পূণ্যের কাজ। কিন্তু দৈহিক সূরত নিয়ে আলোচনার মাঝে আমাদের করণীয় কিছু নেই। শুধু আলোচনার দ্বারা সাওয়াব পাওয়া যায়। কারণ শত চেষ্টা করেও আমাদের সূরতকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সূরতের ন্যায় করা সম্ভব নয়। পক্ষান্তরে তাঁর (সা.) সীরাত নিয়ে আলোচনার দ্বারা সাওয়াব পাওয়াব পাশাপাশি অনুরুপ চরিত্র গঠনের আশা করা যায়, যা দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি।

অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের মুসলিম সমাজের কতিপয় লোক ভালবাসার নামে রাসূলের জীবনাদর্শ ও সুন্নাতকে বাদ দিয়ে রবিউল আউয়াল মাস এলে ঈদে মীলাদুন্নবী ও জসনে জুলুসের নামে নারী পুরুষ সম্মিলিত বর্ণাঢ্য র‌্যালি, আনন্দ মিছিল ও শোভ যাত্রার মধ্য দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মদিনকে শ্রেষ্ঠ ঈদ ঘোষণা করাকে ইবাদত মনে করেন। বস্তুত এসব কার্যাবলী অমুলক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র, যার কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। একটু চিন্তু করলে দেখা যায়, রবিউল আওয়াল মাসের এ দিনটিতে রাসূলের জন্মের ব্যাপারে যথেষ্ট মতানৈক্য রয়েছে, কিন্তু এ দিনটিতে তার ইন্তেকালের ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই। তাহলে আমরা এ দিনটিতে আনন্দ উৎসব পালন করি কিসের ভিত্তিতে?

বরং সত্যিকারার্থে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালবাসার অর্থ হলো, তিনি যে সকল গুণে গুণান্বিত ছিলেন সেগুলোর চর্চা করা ও নিজের মাঝে সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং যে সকল বিষয় তিনি পরিহার করেছেন ও পরিহার করতে বলেছেন তা পরিহার করা। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনীত দ্বীনকে তোমরা আকড়ে ধর, আর যা নিষেধ করেছেন তা পরিহার কর’। (আল হাশর : ৭)।

রাসূলের (সা.) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। এ প্রসেঙ্গে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘তোমাদের মধ্য থেকে যারা পরকালে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের আশা রাখে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ’। (আল আহযাব : ২১)।

কোরআন ও হাদিসে প্রত্যেকটি বিষয় যেভাবে এসেছে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামগণ যেভাবে আমল করেছেন বা করতে বলেছেন সেভাবে করা বা মেনে নেয়ার নামই হলো ইবাদত। এতে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি করাকে শরিয়ত সমর্থন করে না। এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালবাসার ব্যাপারে তিনি যেভাবে ভালবাসতে বলেছেন বা সাহাবায়ে কেরামগণ যেভাবে ভালবাসা দেখিয়েছেন সেভাবে ভালবাসাই হলো ইবাদত। এতে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি করা শরিয়ত সমর্থন করে না। পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপার নিষেধও করেছেন। তিনি বলেছেন, খ্রীষ্টানরা যেমনভাবে ঈসা ইবনে মারিয়ামের (আ.) ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে, তোমরা তেমনিভাবে আমার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর বান্দা, অতএব, তোমরা বল আল্লাহর বান্দ এবং তাঁর রাসূল।

এখানে বাড়াবাড়ি করার অর্থ হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যাবলীর ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন ও সীমালঙ্ঘন করা। যেমন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাজির-নাজির বলা, তিনি নূরের তৈরি, তিনি গায়েব জানেন, তার নামে কসম খাওয়া, তাঁর নামে মান্নত করা, তাঁর নিকট দোয়া ও আশ্রয় প্রার্থনা করা আল্লাহর গুণ সমূহে গুণান্বিত করা ইত্যাদি । এ ধরনের কার্যকলাপ শরীয়তে গর্হিত। তাই এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকবে।

ঈদেমীলাদুন নবীর গোড়ার কথা:
ইরাকের মসল শহরে অত্যাচারী শাসক মজাফফর উদ্দীন কাওকারীর শাসনামলে ৬০৪ হি: সনে ধর্মপ্রিয় জনসাধারণের জনপ্রিয়তা অর্জনের লক্ষ্যে দুনিয়াদার দরবারী আলেম আবুল খাত্তাব দিহয়ার মাধ্যমে সর্বপ্রথম এ মিলাদের প্রচলন শুরু হয়। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুয়াতের ২৩ বছর, খোলাফায়ে রাশেদার ৩০ বছর, পরবর্তী সাহাবিদের ১১০ হিজরী সন, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন ও মুজতাহিদ ইমামগণের ৬০০ হিজরী সন পর্যন্ত ঈদে মিলাদুন্নবীর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই বুঝতে হবে প্রচলিত অনুষ্ঠানাদি শরিয়ত সম্মত নয়। পক্ষান্তরে সাহাবায়ে কেরামের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ভালবাসা ছিল নজীর বিহীন। যারা হুদায়বিয়ার সন্ধিকালে রাসূলের থুথু হাতে মুখে মেখেছিলেন এবং উহুদ প্রান্তরে তালহা (রা.) নিজেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তাতে তার দেহে ৭০টি তীরের আঘাত লেগেছিল। এ ছাড়াও সাহাবায়ে কেরামের নবী প্রেমের অসংখ্য ঘটনা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। তারা কোনো দিন এ ধরণের বাহ্যিক সাজ-সজ্জা, আড়ম্বরতা, মুখরোচক শ্লোগান ও লৌকিকতাপূর্ণ মাসিক বা বাৎসরিক প্রথা হিসেবে কোনো অনুষ্ঠান পালন করেননি। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা রাসূলের (সা.) জীবনাদর্শ অনুসরণ করেছেন। ভালবাসার ক্ষেত্রে তাদের মত সুন্নাতের অনুকরণ ও আদর্শে আদর্শবান হওয়া ইবাদত ও সাওয়াবের কাজ। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা ঈমান আন যেমনি ঈমান এনেছেন মানুষগণ অর্থাৎ সাহাবাগণ’। (আল্ বাক্বারাহ : ১৩)।

সুতরাং তাদের ঈমান ও আমল অনুযায়ী আমাদের ঈমান ও আমল হওয়া বাঞ্জনীয়। তাদের ঈমান ও আমলের প্রতি আল্লাহ তায়ালা খুশি হয়ে বলেন, ‘আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট, তারাই আল্লাহর দলের অন্তর্ভুক্ত। যেনেরেখ আল্লাহর দলই সফলকাম হবে’। (আল মহাদালাহ : ২২)।

হাদিসে এসেছে, ‘নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনে আমাকে নবুয়াত দান করা হয়েছে’। (মুসলিম শরীফ : হা: ১১৬২)।

মুসলিম শরিফে বর্ণিত বিশুদ্ধ এই হাদিস দ্বারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্মদিনে উম্মতের করণীয় কী, তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অন্য হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়ে থাকে। অতএব, রোজা অবস্থায় আমার আমলনামা পেশ করা হোক, এটা আমি পছন্দ করি’। (তিরমিজী শরীফ : ৭৪৭)।

নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মের কারণে বছরের প্রতিটি সোমবার অতি মূল্যবান হয়ে গেছে। তাই এ দিনে নফল রোজার বিধান রাখা হয়েছে। এ দিনে রোজা রাখা প্রকৃত নবী-প্রেমের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য হবে। সোমবার নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর দিন, এটা সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। পক্ষান্তরে ১২ রবিউল আওয়াল তাঁর পবিত্র জন্মদিন হওয়ার কথা কোরআনেও নেই, হাদিসেও নেই। ঐতিহাসিকরাও ১২ তারিখে জন্মের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে সোমবারই হচ্ছে তাঁর পবিত্র জন্ম দিন, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। এ ক্ষেত্রে তারিখ দেখার বিষয় নয়, ১২ তারিখও হতে পারে, ভিন্ন তারিখও হতে পারে।

অতএব, প্রকৃত নবী-প্রেমিক হতে হলে প্রতি সোমবার রোজা রাখা চাই। সঙ্গে বৃহস্পতিবারও  রোজা রাখা উচিত। বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা এগুলো প্রমাণিত। এর বিপরীত দিনের প্রতি লক্ষ্য না করে তারিখের ভিত্তিতে ১২ তারিখকে জন্মদিন ধরে নিয়ে জশনে জুলুস বা মিছিল বের করা একটি মনগড়া কাজ বৈ কিছু নয়। ইসলামের সঙ্গে এসব জশনে-জুলুসের ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা ইসলামের স্বর্ণযুগে এমন মিছিলের বা জন্মদিন পালনের প্রথা খুঁজে পাওয়া যায় না। নবীজির (সা.) এর পবিত্র যুগে জশনে-জুলুস বা জন্মদিন পালনের নিয়ম ছিল না। পরবর্তী সময়ে খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও পালিত হয়নি। সাহাবাদের যুগেও কেউ পালন করেনটি। চার ইমামসহ মুহাদ্দিসীনের কেউ তা পালন করেননি। বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানি (রহ.), খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি আজমীরি (রহ.), শাহজালাল ইয়ামেনি (রহ.) এর মতো বুজর্গদের কেউ তা পালন করেননি।

তাই আসুন, প্রকৃত নবী-প্রেমের বহিঃপ্রকাশ করতে আমরা প্রতি সোমবার নফল রোজা রাখার অভ্যাস গড়ে তুলি। রোজা অবস্থায় আল্লাহর দরবারে আমাদের আমলনামা পেশ করার সৌভাগ্য অর্জন করি। যদি সময়-সুযোগের অভাবে বা অন্য কোনো কারণে সারা বছর এ রোজা পালনের তাওফিক না হয়, তবে কমপক্ষে রবিউল আওয়াল মাসে এ ইবাদতটি আমরা পালন করতে পারি। হয়তো চারটি রোজা রাখা লাগবে। এতে নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ বাস্তবায়িত হবে।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে’। (সূরা: আল আহযাব, আয়াত: ২১)।

অতএব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ মোতাবেক প্রতিটি ইবাদত পালন একজন নবী- প্রেমিক বান্দার একান্ত কাম্য হওয়া উচিত।

আমরা আজ অধঃপতিত কী কারণে? ১৪ শ’ বছর আগের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রকৃত মুহাব্বত বুকে ধারন করে এবং তাঁর সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণ করে সাহাবায়ে কেরাম জিরো থেকে হিরোতে পরিণত হয়েছিলেন, গোটা দুনিয়াকে নিজেদের হাতের মুঠায় নিয়ে এসেছিলেন, তাদের নাম শুনলে কাফির-মুশরিকদের অন্তরে কম্পন সৃষ্টি হয়ে যেত। আর আমাদের অবস্থা হলো- সুন্নত থেকে দূরে সরে পূর্বের তুলনায় অধিক জনবল ও ধনবল থাকা সত্তেও বিশ্বময় আমরা লাঞ্চিত, অবহেলিত, নির্যাতিত। আল্লাহর দুশমনদের গোলামে পরিণত হয়েছি। আমরা কী তাহলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সেই ভবিষ্যদ্ববাণীর প্রয়োগক্ষেত্র হয়ে গেলাম? ‘তিনি বলেছেন, এমন এক যমানা আসবে যখন তোমরা সংখ্যায় হবে অনেক কিন্তু তোমাদের অবস্হা হবে স্রোতে ভেসে যাওয়া তৃণ লতার মতো। যার নিজের কোনো অধিকার নেই।’ দুশমনকে খুশি করতে নিজেদের স্বকীয়তাকে মিটিয়ে দিচ্ছি, মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাদের অনুসরণ করা সত্তেও তারা আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট নয়, মজলুম মুসলমানের আহাজারিতে আজ আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠছে।

অতএব, ভুলে গেলে চলবে না, যতদিন মুসলমান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাতকে নিজের বাস্তব জীবনে প্রকাশ না ঘটাবে ততদিন কেবল তাদের কপালে লা না আর ভর্ৎসনাই জুটবে। সুতরাং আসুন রবিউল আওয়াল থেকে আমরা এ প্রত্যায় নিয়েই সামনে অগ্রসর হব যে, জীবনের সর্বক্ষেত্রে সুন্নাতে রাসূল ও তাঁর আদর্শকে প্রাধান্য দেব এবং সর্বত্র তা বাস্তবায়ন করার আমৃত চেষ্টা চালিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।

সারসংক্ষেপ:  
১. হজরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভালবাসা ঈমানের প্রাণ শক্তি, এ ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় না। ভালবাসার অর্থ হলো, তাঁর চাল-চলন, কথা-বার্তা, উঠা-বসা, শয়ন-স্বপন, নিদ্রা-জাগরণ, পানাহার,  ইত্যাদি সকল ইবাদত ও কাজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুকরণের মাধ্যমে নিজ জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করা।

২. তাঁকে ভালবাসা ও তাঁর আশেক হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো দিন, তারিখ বা সন নেই বরং বছরের প্রতিটি মাস, প্রতিটি সপ্তাহ, প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে ও প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অনুসরণের মাধ্যমে ভালবাসার উজ্জ্বল নির্দশন স্থাপন করা।

৩. ঈদে মীলাদুন্নবী কোরআন হাদিস বহির্ভূত নব আবিস্কৃত ও বর্জনযোগ্য একটি মনগড়া বিষয়।

৪. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম তারিখ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। তাই শুধু মাত্র ১২ তারিখকে জন্মদিন ঘোষণ দেয়া যুক্তি সংগত নয়।

৫. ঐতিহাসিকদের মতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকাল ১২ রবিউল আওয়াল। তাই সেদিন শুধু জন্মদিবস উপলক্ষে ঈদ ও খুশি পালন করা কতটুকু যুক্তি সংগত?

৬. অনেকের ধারণা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মীলাদ মাহফিলে উপস্থিত হন, তাই তাঁকে অভিনন্দন জানাতে দাঁড়িয়ে যান। এটা কোরআন ও হাদিস পরিপন্থী মতবাদ।

৭. আশেক হওয়ার জন্য শুধু রবিউল আওয়ালে মীলাদ মাহফিল, জলসা, জসনে জুলুস, সেমিনার-সেম্পুজিয়াম, আলোচনা সীরাত বিষয়ক অনুষ্ঠান ইত্যাদি করলেই চলবে না। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নত ও আদর্শকে অনুসরণ করে এবং তা নিজের পরিবার, সমাজ ও রাষ্টের মাঝে বাস্তবায়ন করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে হবে। রাসূাল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি অধিক হারে দরূদ পাঠ করা। কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী আমল করা এবং এর বিপরীত সকল প্রকার শিরক, বিদাত ও কুসংস্কার থেকে নিজের বেঁচে থাকা এবং অন্যকেও বাঁচানোর চেষ্টা করা।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে কোরআন-সুন্নাহ মোতাবেক জীবন-যাপন করার ও রাসূলুল্লা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা কে সত্যিকারার্থে ভালবাসার তৌফিক দিন। আমীন।