বাঁধপাড়ের মানুষের সাধের বাড়ি

লিখেছেন সুদীপ্ত সালাম

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলামের জন্ম সিরাজগঞ্জ শহরে। ছোটবেলা থেকেই দেখেছেন শহর রক্ষা বাঁধের ওপারে বসবাস করা প্রান্তিক মানুষগুলোকে। কঠিন সংগ্রামের মধ্যে টিকে থাকা এই মানুষগুলোকে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয় বন্যার সময়। তখন যমুনা নদীর পানি বেড়ে যায়, তলিয়ে যায় নদীর পারের বসতি। দরিদ্র মানুষদের তখন ঘরের বিভিন্ন অংশ ভেঙে উঠে পড়তে হয় বাঁধে। পানি নেমে গেলে আবারও তৈরি করতে হয় নতুন ঘর।

তরিকুল এই মানুষগুলোর জন্য কিছু করতে চেয়েছেন। তিনি তাঁর স্নাতক শেষ বর্ষে যে থিসিসটি জমা দিয়েছেন তার শিরোনাম, ‘কমিউনিটি বেজড ডেভেলপমেন্ট ফর অ্যানুয়ালি ফ্লাড এফেক্টেড পিপল ফর রিভার ব্যাংক যমুনা।’ সেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য এমন একধরনের বাড়ি তৈরির কথা উপস্থাপন করেছেন—যে বাড়ি পানিতে তলিয়ে যাবে না এবং বন্যার কারণে মানুষদের সরেও যেতে হবে না। তাঁর এই উদ্ভাবনী চিন্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং পরীক্ষকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

তরিকুলের প্রকল্প সম্পর্কে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শুভজিৎ চৌধুরী বললেন, ‘আমাদের স্থাপত্য বিভাগের পাঁচ থেকে সাত ব্যাচের মধ্যে তরিকুলের প্রকল্পটি সবচেয়ে ভালো। জুরিরাও বলেছেন, আমরাও বলছি— এটি একটি রুট লেভেল ভালো কাজ। প্রতিবছরই আমরা এমন কাজ আশা করি।’

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম। ছবি: আবদুস সালামশাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম। ছবি: আবদুস সালাম

 

 

 

 

 

একই বিভাগের প্রধান কৌশিক সাহা বললেন, ‘এই ব্যাচের সেরা তিন–চারটা কাজের মধ্যে এটি একটি। সম্ভবত তরিকুলের ডিজাইনটি সর্বোচ্চ নম্বরও পেয়েছে। আমি শিক্ষার্থীদের শহর থেকে বেরিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করি। এটি শহরের বাইরের মানুষদের মাথায় রেখে করা একটি কাজ। তরিকুল প্রথম থেকেই তাঁর প্রকল্পটির প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন। আমাদের এখানে যে বিচারকেরা এসেছিলেন, তাঁরাও প্রকল্পটির প্রশংসা করেছেন।’

তরিকুল বললেন, ‘মানুষগুলোর জমি নেই, থাকার জায়গা নেই। বন্যার সময় তাঁদের পাঁচ থেকে সাত মাস মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। তখন যে ক্ষতিটা তাঁদের হয়, সারা বছরই তাঁদের সেই ক্ষতিপূরণ করতে হয়। তাঁদের জন্যই আমার এই প্রকল্প। এই মানুষগুলোর জন্য এমন একটি স্থাপত্যভিত্তিক সমাধান করা, যাতে তাঁদের আর এই সমস্যার মুখে পড়তে না হয়। এমন এক সমাধান যাতে তাঁদের বাড়িঘর ভাঙতে হবে না, চলে যেতে হবে না, বাড়ির কোনো অংশ পানির নিচে থাকলেও ক্ষতি হবে না। আমার প্রকল্পের লক্ষ্য তা–ই।’

তরিকুল জরিপ করে দেখলেন, প্রত্যেক বাড়িতেই একটি লাউয়ের মাচা থাকে। সেই বাঁশের মাচা তৈরিতে ১০০–২০০ টাকা খরচ হয়। তাঁর প্রকল্প দুটি ঘর উঁচু করে মাঝখানে একটি স্থায়ী মাচা তৈরি করার কথা বলে। দুটি ঘরকে সংযুক্ত করার পাশাপাশি এই মাচা একটি উঁচু খোলা জায়গা তৈরি করবে। দুটি ঘরের বেড়া এমনভাবে তৈরি করা হবে, যাতে প্রয়োজনে সেগুলোকে মাচায় শুইয়ে দেওয়া যায়। এই মাচায় বন্যাকবলিত লোকজন যেমন আশ্রয় নিতে পারবেন, পাশাপাশি হাঁস–মুরগি, ছাগল ইত্যাদি রাখতে পারবেন।

তরিকুল ইসলামের নকশা করা ঘরের মডেল। ছবি: সংগৃহীত

 

 

 

 

 

 

 

 

তরিকুল ইসলামের নকশা করা ঘরের মডেল। ছবি: সংগৃহীত

ঘরগুলো তৈরি হবে প্রধানত ছন, বাঁশের চাটাই, বাঁশের ফ্রেম, পলিথিন ও মাটি দিয়ে। ঘরের কলামের যে অংশটুকু পানির নিচে থাকবে, সেটুকু হবে কংক্রিটের। নদীর পারের ভাসমান মানুষদের একটি ঘর তৈরি করতে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। তরিকুলের দাবি, তাঁর নকশায় ঘর তৈরি করতে খরচ হবে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা।তরিকুল আরও বললেন, ‘এই প্রান্তিক মানুষগুলোর জন্য তাজমহল বানিয়ে দিতে হবে না। তাঁদের জন্য এমন একটি সমাধান দরকার, যা তাঁদের সাধ্যের মধ্যে। ছোট্ট একটি পরিবর্তন, যা তাঁদের বুঝিয়ে দিলে তাঁরা নিজেরাই করে নিতে পারবেন। আমার এই ছোট্ট প্রচেষ্টা, যাতে বন্যাকবলিত মানুষগুলো একটু ভালো থাকার সুযোগ পায়।’