‘দেশপ্রেম থেকে মানুষ কতটা উজ্জীবিত হতে পারে একাত্তর তারই প্রমাণ’

প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য একুশে পদকও অর্জন করেছেন। তার কণ্ঠে বিশ্ববাসী জেনেছিল মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের খবর। সম্প্রতি যুদ্ধ চলাকালীন ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে’র নানা স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন তাসলিমা তামান্না 

তাসলিমা তামান্না: যুদ্ধ শুরুর সময় আপনি কোথায় ছিলেন? সেই সময়ের স্মৃতি…

কামাল লোহানী: আমি তখন দৈনিক পূর্বদেশে চাকরি করি। সেই সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। ২৫ মার্চ রাতে রাজধানীর বস্তিতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, পিলখানায়, রাজারবাগ এলাকায় অতর্কিতে হামলা চালিয়ে নির্বিচারে গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ওই রাতে কত মানুষকে তারা হত্যা করেছে তার সুনির্দিষ্ট ধারণা নেই কারও। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা, ওই রাতে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন। এরপরেই সারা শহরে কারফিউ জারি করা হয়। ২৭ মার্চ যখন কারফিউ প্রত্যাহার করা হয় এক দুই ঘণ্টার জন্য তখন ক্যামেরাটা একটা বাজারের ব্যাগে ভরে আমাদের ফটোগ্রাফার মানু মুন্সীর মোটরসাইকেলে চড়ে প্রথমে মতিঝিল কলোনিতে নিজের পরিবারের খবর নিতে যাই। তারা ভালো আছে জেনে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যাই। ওখানে গিয়ে যে ধ্বংসলীলা ও হত্যাযজ্ঞ দেখলাম তাতে মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি।

তাসলিমা তামান্না: যুদ্ধ শুরুর পর পত্রিকার কাজ কিভাবে হতো?

কামাল লোহানী: ২৫ মার্চের পর টেলিফোন, টেলিপ্রিন্টার, টেলিগ্রাফ বন্ধ থাকায় খবরের কাগজ বের করা নিয়ে একটা বিপজ্জনক অবস্থায় পড়েছিলাম। তারিখটা সম্ভবত ২৮ মার্চ ছিল। ক্যান্টনমেন্টের প্রেস লিয়াজোঁ অফিসার সচিবালয়ে আমাদের ডেকে পাঠালেন। আমি, দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদক মাহবুবুল হক, পাকিস্তান অবজারভারের সম্পাদক সালাম সাহেব দেখা করতে গেলাম। প্রেস লিয়াজোঁ অফিসার কোনো সমস্যার কথা না শুনে কাগজ বের করার ব্যাপারে জোর দিলেন। পরে আমাদের পীড়াপীড়িতে টেলিফোন, টেলিপ্রিন্টার ঠিক করার ব্যাপারে আশ্বাস দিলেন। ওই সময় ওদের পাঠানো প্রেস রিলিজ, পুরনো কিছু বিজ্ঞাপন দিয়ে কোনো রকমে আমরা একটা কাগজ বের করে ওদের দেখিয়েছিলাম। আরও পরে অবশ্য ওরা টেলিফোন, টেলিপ্রিন্টার ঠিক করেছিল।

তাসলিমা তামান্না: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হলেন কীভাবে?

কামাল লোহানী: ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় শপথ গ্রহণ করল। এই সময় আমার মনে হলো এতদিন ধরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছি, পাণ্ডুলিপি লিখছি, ধারা বর্ণনা করছি, স্লোগান দিচ্ছি —এখন আমার এই কণ্ঠটা স্বাধীন বাংলা বেতারে ব্যবহার করা উচিত। তখন আমি স্বাধীন বাংলা বেতারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বহু পথ পাড়ি দিয়ে, অনেক বিপদ এড়িয়ে আরও অনেকের সঙ্গে কলকাতায় গেলাম।

পরিবারের সদস্যদের পার্ক সার্কাসে রেখে বের হলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র খুঁজতে। বাংলাদেশ মিশনের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম কী করব? ভেতরে যাব কিন্তু অনুমতি ছাড়া ঢোকা যাচ্ছে না। নিজের পরিচয়ও দিতে পারছিলাম না। এই সময় বঙ্গবন্ধুর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আমিনুল হক বাদশার সঙ্গে দেখা হলো। তিনি আমাকে ওইদিন বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটা দোতলা বাসায় নিয়ে গেলেন। তখন তিনি আমাকে বললেন, আজ থেকে আপনি এখানেই থাকবেন। এখান থেকেই সব নিউজ করবেন। সেখানে তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভ ট্রান্সমিটার উদ্বোধনের আয়োজন চলছিল।

তাসলিমা তামান্না: বালিগঞ্জে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক যাত্রা কত তারিখে?

কামাল লোহানী: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের জন্মদিন অর্থাৎ ২৫ মে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালু হয়। কাগজ-কলম-চেয়ার-টেবিল কিছুই ছিল না। কিন্তু তার মধ্যেই আমাদের কাজ শুরু করতে হবে। প্রথমে দুটো সেশন চালু হলো। বাংলা বুলেটিনটা পড়লেন সৈয়দ হাসান ইমাম, সালেহ আহমেদ নামে। ইংরেজি বুলেটিন লিখলাম ও পড়লামও আমি। এরপর ধীরে ধীরে আলমগীর কবির, আলী যাকের, পারভিন হোসেন, নাসরিন আহমেদ এসে যোগ দিলেন। তখন নিউজ ডিপার্টমেন্টটা বেশ সমৃদ্ধ হলো।

তাসলিমা তামান্না: সংবাদ সংগ্রহের কাজ কীভাবে হতো?

কামাল লোহানী: সংবাদ সংগ্রহের জন্য আমরা নিউজ মনিটর করতাম। আকাশবাণী, আনন্দবাজার পত্রিকা, স্টেটসম্যান পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধের যে খবরগুলো আসত সেগুলো আমরা উল্লেখ করতাম। কারণ ওই খবরগুলো বংলাদেশে বসে কেউ পেত না। প্রথম দিকে আমাদের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। বিবিসি, ভয়েজ অব আমেরিকা, রেডিও অস্ট্রেলিয়া এগুলো থেকেও আমরা উদ্ধৃতি দিতাম।

তাসলিমা তামান্না: মুজিব সরকারের সঙ্গে ওই সময় যোগাযোগটা কেমন ছিল আপনাদের?

কামাল লোহানী: মুজিব সরকারের সঙ্গে যোগাযোগটা নিয়মিত ছিল। কারণ থিয়েটার রোডেই ছিল মন্ত্রিসভার সচিবালয়। মুজিব সরকারের কর্মকাণ্ড আমাদের জানানো হতো। আমরা নিজেরাও চেষ্টা করতাম জানার জন্য। যারা এমএনএ ছিলেন তারা যেসব জায়গায়  যেতেন, বক্তৃতা করতেন, সেগুলো আমরা জেনে নিতাম। অনেক সময় ফোনে জেনেও নিউজ তৈরি করতাম। পরে প্রতিনিধি ঠিক করা হয়েছিল। তারা রেকর্ডার নিয়ে বের হতো। সাক্ষাৎকার নেওয়া, বাংকারে গিয়ে মুক্তিফৌজের সঙ্গে কথা বলা এগুলো করত।

তাসলিমা তামান্না: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ওই সময় সংবাদ ছাড়া আর কী ধরনের অনুষ্ঠান সম্প্রচার হতো?

কামাল লোহানী: কথিকা, গান, নাটক এসব কিছুই প্রচার করা হতো মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করতে। এর মধ্যে এম আর আখতার মুকুল রচিত ও উপস্থাপিত ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানটি খুবই জনপ্রিয় ছিল। মুকুল গলার স্বর বিকৃত করে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় এটি পড়তেন।

তাসলিমা তামান্না: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিশেষ স্মৃতি…

কামাল লোহানী: অসংখ্য টুকরা টুকরা স্মৃতি রয়েছে। সানজিদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে মুক্তিসংগ্রামী একটা শিল্পী দল এসে অনেকগুলো গান রেকর্ড করে দিয়েছিল। কিছু গান আমরাও করেছিলাম। এরপর আর নতুন গান পাচ্ছিলাম না। গানের সংকটের কারণে নতুন যারা এসেছিল তারাও গান লেখা শুরু করে দিল। এই সময় পশ্চিমবঙ্গের গোবিন্দ হালদারের কাছ থেকে বন্ধু কামাল আহমেদের মাধ্যমে ২৪-২৫টা লেখা গান পেলাম। আপেল মাহমুদ ওখান থেকে একটা গানের সুর করল যেটা হচ্ছে, ‘মোরা একটি ফুলকে বাচাবো বলে যুদ্ধ করি।’ এই গানটি মুক্তিযোদ্ধাদের দারুণ উদ্দীপ্ত করেছিল। এই গানটা প্রথম প্রচার হওয়ার পর পরই আমার এক পরিচিত ভদ্রমহিলা ফোন করে বেশ ক্রুদ্ধ স্বরে বলেছিলেন, ‘তোমরা কি প্রেম করতে এসেছ না যুদ্ধ করতে?’ মোরা একটি ফুলকে বাচাবো বলে যুদ্ধ করি এটা দিয়ে তো তাই বোঝায়। আমি তাকে বললাম, তুমি কি পরের লাইন শুনেছ? যেখানে বলা হয়েছে, মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি। ভদ্রমহিলা বললেন, ‘তোমরা যাই বল না কেন এটা শুনলে মনে হবে তোমরা প্রেম করতে এসেছ, যুদ্ধ নয়’। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সে আমৃত্যু এ জিনিসটাই বিশ্বাস করে গেছে।

আরেকটা ঘটনা হলো যুদ্ধকালীন ঈদের সময় ঢাকা পূর্বাঞ্চলের এমএনএ আশরাফ আলী খান আমাদের অনুরোধে ঈদের সময় এক ডেকচি খিচুড়ি আর গরুর মাংস নিয়ে এলেন। আমরা সবাই খুব মজা করে খেলাম। কিন্তু খাওয়ার আগে ওখানকার সিকিউরিটি গার্ডদের কিছু জানানো হয়নি। পরে যখন ওরা বুঝতে পারল আমরা গরুর মাংস খেয়েছি তখন কিছুতেই ওরা আর ওখানে থাকতে চাইছিল না। শেষ পর্যন্ত ওখানকার একজন বড় কর্মকর্তা মি. দাশ তাদের বুঝিয়ে শান্ত করলেন।

একবার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তিনদিন কর্মবিরতি হয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো মুক্তিসংগ্রামে বেতার কেন্দ্র বন্ধ থাকে না। পদ, পদবি এবং বেতনের স্কেল ঠিক করার দাবি নিয়ে কয়েকজন এটা করেছিল। আমরা দুই-তিনজন আপত্তি করলেও ওরা শোনেনি। এটা একটা দুঃখজনক স্মৃতি।

তাসলিমা তামান্না: যুদ্ধচলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতারের ভূমিকা কতটা জোরালো ছিল বলে মনে করেন?

কামাল লোহানী: মুজিব সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যখন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন তখন অন্য সব চাহিদার সঙ্গে একটা শক্তিশালী ট্রান্সমিশনের দাবি করেছিলেন, যা দিয়ে যুদ্ধে একটা প্রচার চালানো যায়। কারণ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে বেতার সমস্ত মানুষের মনে শক্তি ও সাহস জোগায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সেই ভূমিকাটাই রেখেছিল।

তাসলিমা তামান্না: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিজয়ের ঘোষণা সম্পর্কে জানতে চাই…

কামাল লোহানী: ১৬ ডিসেম্বর রেডিও মনিটর করতে গিয়ে আমরা শুনতে পেলাম ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিকাল সাড়ে ৪টার সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করবে। আমরা হৈ হৈ করে উঠলাম। সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ বুলেটিন এবং গান তৈরি করা হলো। যেহেতু আমি নিউজের প্রধান এ কারণে আমাকে বিশেষ বুলেটিনটা লিখতে হলো। ৫ লাইন লিখলাম। এর মধ্যে প্রথম তিন লাইন পাকিস্তান বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে হানাদার, দখলদার, হারমান, পিশাচ —এরকম অনেক গালি দিয়ে লিখলাম তারা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছে মুক্তিফৌজের কাছে। এটা পড়তে দেওয়া হলো বাবুল আখতার বলে এক জুনিয়র ছেলেকে। কিন্তু বিজয়ের সংবাদ পড়ার মধ্যে যে বলিষ্ঠতা দরকার সেটা বারবার চেষ্টা করেও সে আনতে পারছিল না। তখন সবাই আমাকে পড়তে বলল। আমি উত্তাপটা বজায় রেখে সেটা পড়লাম। পড়ার সময় কিছু মনে হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের পর নিউজটা যখন অন ইয়ার হলো তখন আমার সমস্ত শরীরটা শিউরে উঠছিল। দীর্ঘদিনের লড়াই, সংগ্রামের পর বিজয়ের ঘোষণাটি আমার কণ্ঠে পৃথিবীর মানুষ জানতে পারল —এটা আমার জীবনের একটা বড় অর্জন।

ওইদিন আমাদের সহযোদ্ধা শহীদুল্লাহ একটা গান লিখলেন। দুই লাইন করে লিখছেন, সুজেয় শ্যাম সেটার সুর করছেন। আর অজিত রায় ওই সুরটা গলায় তুলে নিচ্ছেন। এই করতে করতে ১৯ মিনিটের মধ্যে গানটা তৈরি হয়ে গেল। তারপর কোরাসে গানটা রেকর্ড করা হলো। নিউজ শেষ হওয়ার পরপরই গানটা বাজানো হলো। গানটির কথা ছিল বিজয় নিশান উড়ছে ওই/ উড়ছে বাংলার ঘরে ঘরে। মানুষ যে দেশপ্রেম থেকে কতটা উজ্জীবিত হতে পারে একাত্তর তারই প্রমাণ।

তাসলিমা তামান্না: কলকাতায় বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ হতো?

কামাল লোহানী: তাদের প্রচুর আগ্রহ ছিল। তাদের ভূমিকাও অসাধারণ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের নিউজগুলো তারা নিয়মিত প্রচার করত। কিন্তু আমরা যোগাযোগ করতাম না। কারণ বাংলাদেশের মুক্তিফৌজ এটা করছে, অন্য কারও সাহায্য নিয়ে করছে না এই জিনিসটাই আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি। অনেক পরে অবশ্য কাজী সব্যসাচী নজরুলের কিছু কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।

তাসলিমা তামান্না: যে উদ্দেশ্য নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়েছিল তা কতখানি অর্জন হয়েছে বলে মনে করেন?

কামাল লোহানী: মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ছিল গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র। মুক্তিযুদ্ধে চেতনা বলতে যা বোঝায় এবং যে কারণে নয় মাস ধরে লড়াই করা হলো, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে মাতৃভূমির সম্ভ্রম রক্ষা হলো, সেই জায়গা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি। যে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু স্পষ্টভাবে না বলে গিয়েছিলেন, সেখানে জামায়াতে ইসলাম অনুপ্রবেশ করে যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে। হেফাজতে ইসলাম যা বলছে, যে প্রেসক্রিপশন দিচ্ছে সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। পাঠ্যপুস্তকে রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দীন, সত্যেন সেন, রমেশ দাশ গুপ্ত, হুয়ায়ুন আজাদ সবাই বতিল হয়ে যচ্ছে। যে বোনটি ছবিতে ফ্রক পরা ছিল, তাকে কামিজ পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ওড়না চড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যে ভাইটি হাফ প্যান্ট, শার্ট পরত তাকে পাঞ্জাবি পায়জামা পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা কি ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে না?

পরবর্তী প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। জিপিএ ফাইভের লড়াই ছেলেমেয়েদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। তাদের আইকিউ ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। স্কুলে পড়াশোনা নেই, কোচিং বাণিজ্য হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ক্রমশ ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং নানা ধরনের দুর্নীতির মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। অর্জন আছে বটে কিন্তু একাত্তরের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বঙ্গবন্ধু চেয়েছেন আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে চর্চা করতে হবে। দেশে-বিদেশে সেটা পরিবেশন করতে হবে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। শিল্পকলা একাডেমির কয়টি শাখা আছে সারাদেশে?

১৯৬৫ সালে আইয়ুব খান হিন্দুদের অর্পিত সম্পত্তিগুলো দখল করে নিয়েছিল, বাংলাদেশ হয়ে যাওয়ার ৪৭ বছর পরও সেগুলো আমরা ফেরত দিতে পারিনি। অথচ মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রী সভার সিদ্ধান্ত ছিল বিজয়ের পরপরই এসব সম্পত্তি নিজ নিজ মালিকের হাতে দিয়ে দেওয়া হবে। আজকে তাদের হত্যা করা হচ্ছে, বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাদের জমি দখল করা হচ্ছে, নারীদের অত্যাচার করা হচ্ছে, এগুলোর কোনো কিছু তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যায় না।

তাসলিমা তামান্না: নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্য আপনার বক্তব্য কী?

কামাল লোহানী: ছোটবেলায় পাঠ্যবই ছাড়াও আমরা বাইরের বই পড়েছি। রাজনীতি, জীবনধারটা কি সেটা জানার চেষ্টা করেছি। বড়দের কাছে জিজ্ঞেস করে জেনেছি। জানার আগ্রহই কমে গেছে এই প্রজন্মের মধ্যে। নতুন প্রজন্ম যদি আবারও বড়দের সঙ্গে বসে, নিজেরা বই পড়ে মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাসটা চর্চা করতে চেষ্টা করে তাহলে বোধহয় আবার আমরা পুরনো দিনটা ফিরে পাব। তাদের ফিরিয়ে আনার দায়িত্বটা অবশ্য বড়দেরই। তরুণরাই দেশের  ভবিষ্যৎ। এই ভবিষ্যতের ওপরই নির্ভর করছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। দেশের উন্নয়ন হচ্ছে —এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেই সঙ্গে বৈষম্য বাড়ছে, শ্রেণিতে-শ্রেণিতে, আয়-ব্যয়ে। এসব বৈষম্য কমাতে তরুণদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

তাসলিমা তামান্না: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

কামাল লোহানী: ধন্যবাদ