অল্প-স্বল্প-গল্প

জসিম মল্লিক

(পূর্ব প্রকাশের পর)

চলো না ঘুরে আসি
১. বেড়ানো খুব ভাল জিনিস। বেড়াতে আমি খুব পছন্দ করি। বেড়ানোর কথা মনে হলেই আমি খুউব উচ্ছসিত হই। রোমাঞ্চিত হই। বেড়াবো মনের আনন্দ নিয়ে কিন্তু সেসব নিয়ে ভ্রমনকাহিনী লিখতে বসা অসহ্য। পকেটে কাগজ কলম নিয়ে একদম ঘুরতে পারি না আমি। বইমেলার সময়ের কথা বলা যাক। প্রুতবছরই আমার একটা দুটো বই প্রকাশিত হয়। সেইসব বই ঢাকা বা নিউইনয়ক বা টরন্টোর মেলায় থাকে। বইয়ের সাথে আমিও থাকি। কেউ হয়ত বই কিনেছে। অটোগ্রাফ চায়। কিন্তু আমার পকেটে কলম থাকে না! কী যন্ত্রণার কথা। তখন প্রায়শঃই পাশের মানুষকে বলি কলম হবে! অথবা স্টলের সেলস ম্যানকে বলি কলমটা দাওতো! যারা বই কেনে তারা অবাক হয়। বলে আপনে কেমন লেখক কলম থাকে না! প্রতিদিন মনে করি আজকে কলম নিয়ে বের হবো কিন্তু ভুলে যাই যে আমি লেখক আমার একটা কলম থাকা উচিত।
২. যাইহোক প্রসঙ্গ বেড়ানো নিয়ে। প্রায়ই পত্রিকায় দেখি বঙ্গ ললনারা বিশ্বভ্রমণ করছে। এ পযন্ত তিনজন পেয়েছি যারা বিশ্ব জয় করতে বের হয়েছে। সেদিন একজন লিখেছে, ভাইয়া টরন্টো আসতেছি। সময় হবে আপনার! দেখা করব। তারপর দেখি পতাকা উঁচিয়ে ছবি দিয়েছে। ক্যাপশন ১৫০ দেশ জয়! গবে বুক ভরে যায়। একজীবনে ১৫০ দেশ ভ্রমণ কম কথা না। আরো হয়ত ভ্রমণ করবে সে। বঙ্গললনারা ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বময়। তারা কেউ অবশ্য এখনও এসব নিয়ে বই লিখেছে কিনা জানা নাই। লিখলে কিনে পড়ব। কত কি জানার আছে!
আমার ছেলে মেয়েও ঘুরতে পছন্দ করে। অক তো একবার এলগনকুইন পাকে আড়াই মাস কাটিয়ে এসেছিল একা। তখন তার মাত্র আঠারো বছর বয়স! সেই থেকেই তার মধ্যে ভ্রমন পিপাসা ঢুকে গেছে। যখনই সুযোগ পায় বেড়িয়ে পড়ে। বিয়ের পর এটা বেড়েছে কারণ তারা দুজনই এক রকম। পায়ের নিচে শষে নিয়ে ঘোরে। গত দু’বছরে তারা কমপক্ষে বিশটি দেশ ঘুরেছে। আমার মেয়ে অরিত্রি একসময় খুব ঘর কুনো ছিল জেসমিনের মতো কিন্তু এখন হাজবেন্ডের সাথে সাথে খুব ঘুরে বেড়ায়। ক্যালিফোনিয়ার রাস্তা ধরে ছুটে চলে শত শত মাইল। ছুটি ছটা হলেই বেড়িয়ে পড়া। একবার এমন হয়েছে অ র্বাসিলোনা থেকে ফিরছে আর অরিত্রি যাচ্ছে। আটলান্টিকের উপর কোনো এক সময় তারা ক্রস করেছিল।
৩. আমারও বেড়ানোর অদম্য ইচ্ছা। ছোটবেলা থেকেই একটা উড়ু উড়ু ভাব আছে আমার মধ্যে। এক জায়গায় বেশিদিন থাকতে পারি না। অস্থির লাগে। কিন্তু সংসারের নানা দ্বায়িত্ব আর জেসমিনের অনীহার কারণে একসাথে খুব বেশি ঘোরা হয় না আমাদের। তাও একজীবনে কমও ঘুরিনি।বেশিরভাগই বন্ধুদের সাথে। ছেলে মেয়ে বা অন্যরা যে এতো ঘুরে বেড়ায় তাতে জেসমিনের কোনো আপত্তি নাই। অনেক প্রাউড সে। সারাক্ষণ সেসব গল্প করে। ছবি দেখে বসে বসে। যেনো সে নিজেই ওদের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার চোখে মুখে বেড়ানোর আনন্দ ফুটে ওঠে। কিন্তু নিজে বেড়াতে পছন্দ করে না।
যখনই আমি বলি, চলো জেসমিন কোথাও বেড়িয়ে আসি তখনই তার নানা সমস্যা এসে হাজির হয়। দু’চারটা কথা শুনিয়ে দিতেও ছাড়ে না। এই তো কদিন আগে দুবাই ঘুরতে গেলা, এর আগে গেলা মালয়েশিয়াৃ। শখের শেষ নাই। অক অরিত্রি প্রায় বলে মা যাও কোথাও ঘুরে আসো। আমরা টিকটি করে দেই। কিন্তু জেসমিনের মন গলানো এতো সহজ কাজ না। জেসমিনের কথা হচ্ছে এতো বেড়ানোর দরকার কি! বেড়ানো ছাড়াইতো জীবন পার হয়ে যাচ্ছে! পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ আলাদা। চিন্তায় আলাদা, ব্যাক্তিত্বে আলাদা। এবং এসব নিয়েই এই আমাদের জীবন। মন্দ নয় তো!
টরন্টো ৩০ আগষ্ট ২০১৯
মানুষ প্রকৃতপক্ষে খুবই একা
এমন কিছু মানুষ আছে যাদের প্রতি আমি প্রচন্ড টান অনুভব করতাম, বন্ধুত্ব কামনা করতাম, সাহচর্য্য কামনা করতাম, সখ্যতা করতে চাইতাম অথচ তাদের কেউ কেউ আমার প্রতি তেমন আগ্রহ দেখায়নি। উপেক্ষা করেছে। এমনও হয়েছে হোক সে পুরুষ বা নারী আমি বিশেষ পছন্দ করে ফেলেছি, আমাকে মুগ্ধ করেছে, এখন আমি তার সঙ্গ চাই। ভাবি তার সাহচর্য্য আমাকে আনন্দ দেবে, আমার সময়টা ভরে উঠবে হাসিতে। কিন্তু দেখা গেলো সে আমাকে কোনো ণ্ডরুত্ব দেয়নি। ইগনোর করছে। তখন আমার আবেগটা মাঠে মারা যায়। হৃদয় ভেঙ্গে যায়! কাল সে যেমন ছিল আজ তেমন নাই। বদলে গেছে! আমি তার দরজা থেকে ফেরত চলে আসছি। আমাকে সময় দেওয়ার মতো সময় তার নাই।
পক্ষান্তরে আমিও এমন আচরন করি। অনেকেই আমার বন্ধুত্ব চেয়েছে, আমার সাহচর্য্য চেয়েছে, আমার ভালবাসা চেয়েছে কিন্তু আমি তাদের তা দেইনি। উপেক্ষা করেছি। অবহেলার চোখে দেখেছি। এটাই হলো জীবনের রহস্য। একেই বলে প্রকৃতির শোধ। কিন্তু কেনো এমন হয়! আবার এমনও হয়, যে আমাকে উপেক্ষার চোখে দেখেছে, একদিন সেই আবার আমার প্রতি আগ্রহ দেখায়, আমার সঙ্গ কামনা করে। আমিও এমনটা করি। আসলে প্রকৃতির রহস্য বোঝা বড়ই মুস্কিল। মানুষের মনের রহস্য বোঝা আরো মুস্কিল। মানুষ প্রকৃতপক্ষে খুবই একা।
টরন্টো ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
অসুখের দিনণ্ডলো
১. আমার যখন শরীর খারাপ থাকে তখন কিছুই করতে ইচ্ছে করে না। মুখ গোমরা করে বসে থাকি। পৃথিবীর তাবৎ ঘটনাবলীর উপর বিরক্ত। জেসমিনের উপরও বিরক্ত। যেনো আমার অসুস্থ্যতার জন্য জেসমিন দায়ী। শুধু অর্ক অরিত্রি আসলে একটু ভাল লাগে। ওরা কত সহানুভূতিশীল বাবার উপর। মোলায়েমভাবে কথা বলে। ডাক্তারের কাছে যেতে বলে। রেষ্ট নিতে বলে। অসুখের সময় কড়া কথা শুনতে কার ভাললাগে! শাসন অসহ্য লাগে। অসুখের দিনণ্ডলোতে টিভি দেখতে ভাল লাগে না, সিনেমা দেখতে ভাল লাগে না, খেলা দেখতে ভাল লাগে না, লিখতে ভাল লাগে না, কারো সাথে কথা বলতে ভাল লাগে না, খেতে অরুচি লাগে, চ্যাটিং করতে ভাল লাগে না, বাংলাদেশের পত্রিকায় খুন আর ধর্ষনের খবর পড়তে অসহ্য লাগে। এমনকি ফেসবুকের পান্ডিত্যটাইপের কোনো পোষ্ট পড়তেও ইচ্ছে করে না। হয়ত চুম্বনও তেতো লাগবে!
২. শুধু ভাল লাগে বই পড়তে। সিরিয়ািস কোনো বই না, হালকা টাইপ বই। হালকা বলতে বটতলার সস্তা টাইপ লেখা বই না। উন্নত মানের লেখা বই এবং তা অবশ্যই থ্রিলার বা গোয়েন্দা কাহিনী হতে হবে অথবা রোমান্টিক কোনো উপন্যাস। কোনান ডয়েল বা আগাথা ক্রিষ্টি হলে চলবে। বোমকেশ, ফেলুদা বা কিরীটি রায় হলেও সমস্যা নাই। তবে মাসুদ রানা প্রথম চয়েস। বাংলা ভাষায় মাসুদ রানার মতো থ্রিলার খুউব বেশি লেখা হয়নি বলেই আমার মনে হয়। গোয়ান্দা টাইপ লেখা অনেক হয়েছে এবং সেণ্ডলো জনপ্রিয় হয়েছে। কাজীদার মতো স্মার্ট গদ্য বাংলা সাহিত্যে খুউব অল্প দু’একজন লিখতে পারেন।
আর এই দু’একজনের অন্যতম হচ্ছেন, যার লেখা পড়ে আমি সবসময় মুগ্ধ এবং অনুপ্রানিত তিনি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তার প্রায় সব লেখাই আমার পড়া। কিন্তু এই অসুখের দিনে আমি ঠিক করলাম বড়দের জন্য লেখা তার থ্রিলার বা গোয়েন্দা কাহিনীণ্ডলো পড়ব। যেই ভাবা সেই কাজ। শুরু করলাম লালবাজারের গোয়েন্দা শবর সেন ণ্ডপ্তকে দিয়ে।
৩. এই ক’দিনে পড়লাম বিকেলের মৃত্যু, কাপুরুষ, ঋণ, আলোয় ছায়ায়, সিঁড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে, প্রজাপতির মৃত্যু ও পুর্নজন্ম, কালো বেড়াল সাদা বেড়াল, পদক্ষেপ, ঈগলের চোখ, রুপ, মারীচ রহস্য ইত্যাদি। বিকেলের মৃত্যু এবং কাপরুষ অবশ্য শবর সেনকে নিয়ে লেখা না। বিকেলের মৃত্যু খানিকটা কল্প বিজ্ঞান, খানিকটা মফিয়া এবং প্রেম। সাদা বিড়াল কালো বিড়াল পুরোপুরি থ্রিলার। রুপ একটি বড়
গল্প। জানিয়ে রাখি আমার সব সময়ের প্রিয় বই আগাথা ক্রিষ্টির টুওয়া্ডস জিরো। যাউকগা বেশি পন্ডিতি করতেছি। আদার বেপারির জাহাজের খবর নেওয়া মানায় না। অসুখের দিনণ্ডলোতে কি করেছি সেটাই বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলাম। আপনারাও অসুখে বই পড়ুন।
টরন্টো ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯