শ্রীশ্রী মধুসূদনের কানাডা গমন

লিখেছেন অমৃত রাম ভট্টাচার্য

পূন্যভূমি শ্রীহট্ট তিনটি সতীপীঠ, অসংখ্য দেবস্থান ও প্রাকৃতিক লীলা বৈচিত্রে অংকিত। যার প্রতিটি জনপদে ব্রাক্ষ্মণ পন্ডিত ও জমিদারদের বসতি ছিল। প্রত্যেকের বাড়িতে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সহিত শিব, শালগ্রাম নিত্য পূজার ব্যবস্থা ছিল। তাছাড়া এরই সঙ্গে মহামায়া আদ্যাশক্তি বিভিন্ন নামে অনেক পরিবারে ইষ্টদেবীরূপে পূজা করা হচ্ছিল। ভারতবর্ষ বিভাজন ও রাজনৈতিক অনেক কারনে আর্য্যঋষিদের দান ও পূর্বাচার্য্যদের পরিচালিত ধর্মীয় অনুশাসন ও শালগ্রামচক্র, শিবলিঙ্গ এবং শক্তি প্রতিমাদের পূজা অর্চনা বিশেষ ভাবে বিঘিœত হয় ও এলোমেলো অবস্থা ধারন করে।


এরই সূত্র ধরে আমাদের মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর থানার ইন্দেশ্বর পরগনার উত্তর ভাগ গ্রাম নিবাসী সর্বজন শ্রদ্ধেয় জমিদার তৎকালীন স্বদেশী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ স্বর্গীয় যতীন্দ্র মোহন সিংহ চৌধুরীর বাড়িতে বংশ পরম্পরায় শ্রী শ্রী মধুসূদনের পূজা চলে আসছিল। উক্ত জমিদারদের দান ইন্দেশ্বর উপ-স্বাস্থকেন্দ্র, যার অতীত নাম ছিল ‘ইন্দেশ্বর কালাজ্বর হাসপাতাল’।
ব্যক্তিগত জীবনে যতীন্দ্র মোহন সিংহ পাঁচ কন্যার জনক ছিলেন। কোন পুত্র সন্তান ছিল না। তাই যতীন্দ্র বাবু ও তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর ঐ বাড়ি-ঘর ও কুলদেবতা রক্ষা করার কোন ব্যবস্থা না থাকায়, খলাগ্রাম নিবাসী শ্রী পরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয়ের নিকট মধুসূদনকে রাখা হয়। দীর্ঘদিন যাবত মধূসুধনের পূজা চলে আসছিল খলাগ্রামে।
একদিন হঠাৎ আমার কাছে আসলেন কমলগঞ্জ থানার সরিষাকান্দি নিবাসী বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শ্রী নিহারেন্দু ভট্টাচার্য মহাশয় এবং বললেন কানাডায় তাঁর আত্মীয় শ্রী রীতিশ চক্রবর্তী (শ্রী রাশী চক্রবর্তী) অনেক ভক্তবৃন্দ নিয়ে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই মন্দিরে একজন শালগ্রাম চক্রের প্রয়োজন। যদি আমার জানামতে কোন শালগ্রাম চক্র থাকেন এবং কানাডায় প্রেরণ করা যায় তাহলে ভাল হয়।
এমতাবস্থায় আমি যতীন্দ্র মোহন সিংহ চৌধুরী মহাশয়ের ভাতিজা বিশিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও সমাজ সেবামূলক অনেক কাজের সাথে জড়িত শ্রী দেবজ্যোতি সিংহ চৌধুরীর (মন্টুবাবু) সাথে আলোচনাক্রমে শ্রী পরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয়ের নিকট হইতে উক্ত মধূসুধনচক্র শ্রী নিহারেন্দু ভট্টাচার্য মহাশয়ের মাধ্যমে কানাডায় প্রেরণ করি।
কানাডার মন্ট্রিয়লে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে উক্ত মধুসূদন বিষ্ণুচক্রের পূজার পর সেখানের ভক্ত মহলে মধুসূদনের আগমন কাহিনী ও পূর্বাবস্থা সম্পর্কে সকলের জানার ইচ্ছা হয়।
এই মর্মে কানাডা প্রবাসী রাজনগর থানার মহাসহস্র গ্রামের শ্রী কৃষ্ণপদ সেন মহাশয়, মন্ট্রিয়লের মন্দিরে স্থাপিত শালগ্রাম চক্র পাঠানোর বিষয়ে আমার সংশ্লি­ষ্টতা শুনে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই ইতিহাস জানতে চাইলে আমি এই ক্ষুদ্র ইতিহাস তাঁকে প্রদান করি। ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই।
উক্ত মন্দিরের পুরোহিত মহাশয় ও ভক্তবৃন্দ এবং কানাডা প্রবাসী সকল সনাতনী ভক্তের মঙ্গল কামনা করে শ্রীশ্রী মধুসূদনের রাতুল চরনে জানাই শতকোটি দন্ডবৎ।

পাদটিকা : আমি (কৃষ্ণপদ সেন) ২০১৬ সালে ২১ বছর পর কানাডা থেকে বাংলাদেশে যাই। ইতিপূর্বে আমাদের কুলদেবতা শিবলিঙ্গ মন্দির থেকে চুরি হয়ে যায়। আমার দেশে যাওয়ার অনেক উদ্দেশ্যের মধ্যে উক্ত শিবলিঙ্গ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা অন্যতম ইচ্ছা ছিলো। যেহেতু দীর্ঘদিন আমি দেশের বাহিরে তাই তখন উপযুক্ত পূজারী ব্রাক্ষ্মণ পন্ডিত সম্পর্কে আমার কোন ধারণা ছিলো না। এ বিষয়ে সদ্য মৌলভীবাজার থেকে আগত এডভোকেট ফনিন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য মহাশয়ের কাছে উপযুক্ত পূজারী ব্রাক্ষ্মণ পন্ডিতের সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি আমাকে শ্রী দুলাল ভট্টাচার্যের সন্ধান দেন। দেশে গিয়ে সিলেটের কাষ্টঘরে তার সাথে যোগাযোগ করি। তখন কথা প্রসঙ্গে আমি মন্ট্রিয়ল থেকে এসেছি জেনে তিনি আমাকে মন্ট্রিয়লের মন্দিরে মধুসূদনের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং জানতে চান। আমি তাকে বিস্তারিত জানাই এবং তিনি আমাকে মন্ট্রিয়লে মধুসূদন পাঠানোর বিষয়ে তার সম্পৃক্ততার কথা জানান। তখন আমি তাকে জানাই এ ইতিহাস তো প্রবাসের অনেকেই জানেন না তাই আমাকে লিখিত দিলে আমি তা আমাদের পূজার স্মরণিকায় প্রকাশ করার আগ্রহ ব্যক্ত করি।
২০১৯ সালে বাংলাদেশে যাই এবং তাঁর সাথে আবার দেখা হলে আমি তার পূর্ব প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি আমাকে এই সংক্ষেপিত ইতিহাসটুকু লিখিত আকারে দেন। আমি আগষ্ট মাসে সংকলনের দায়িত্বপ্রাপ্ত গোপেন দেবকে লেখাটি দিতে চাইলে তিনি জানান সংকলনের জন্য লেখা জমা দেয়ার সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে। তাই তার পক্ষে তা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে সাপ্তাহিক ভোরের আলো দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা বের করতে যাচ্ছে জেনে এবং লেখার গুরুত্ব বিবেচনা করে তা ভোরের আলো পূজা সংখ্যায় পাঠকদের এ ইতিহাস জানানোর উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হলো।
সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা।