পূজার স্মৃতি, স্মৃতির পূজা

লিখেছেন প্রীতম দাস

Nostalgia কথাটার যথার্থ বাংলা খুঁজতে অভিধানের শরণ নিলাম। ঘরে ফেরার ব্যাকুলতা, অতীতবিধুরতা, স্মরণবেদনা, স্মৃতিবেদনা। স্মৃতির কাছে ফিরে ফিরে যাবার যে অদ্ভুত টান, তাকেই বোধ হয় নস্ট্যালজিয়া বলে।

স্মৃতি জিনিসটা বেশ অদ্ভুত। পুরনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানোর মাঝে একধরণের রোমান্টিকতা আছে। স্মৃতি নাকি সততই সুখের হয়। যে স্মৃতি বেদনার, সময়ের সাথে তার ধার কমে যায়। এ বড় সত্য কথা। কিন্তু যে স্মৃতি আনন্দের, বহুদিন পরে বহুদূরে বসে তাকে রোমন্থন করতে গিয়ে একটা হাহাকার কি জাগে না? যে দিন গেছে, তাকে সোনার খাঁচায় আটকে রাখতে না পারার আক্ষেপটাও তো তার সাথে ছায়ার মতো লেপটে থাকে। স্মৃতি বরং জীবনের মতোই, দুঃখসুখের মিশেল থাকে বলেই সে সুন্দর। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, এও তেমন এক ‘সুখের মতো ব্যথা’

এবং আপাতত এই পরবাসে দুর্গা পূজার সময়টায় স্মৃতির সাথে খানিকটা সময় খরচ করাটা খারাপ প্রস্তাব নয়।

প্রবাসে এবারই প্রথম পূজা। অভ্যস্ত উত্তাপটা এবার তেমন বোধ হচ্ছে না। একটা নির্লিপ্ত অনাগ্রহের সাথে খানিকটা মন খারাপ মিলেমিশে অন্যরকম একটা অনুভূতি হচ্ছে, যার সাথে আগে পরিচয় হয়নি। এজন্যই বোধহয় বলে, গোটা জীবনটাই শেখার সময়। নতুন অনুভূতি, নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন স্মৃতি।

পূজার ঠিক আগের ব্যস্ততাটা এবার নেই। মহালয়ার দিন থেকেই বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধুদের ফোন পাওয়া শুরু হতো। কবে আসা হবে, কোথায় যাওয়া হবে, কী কেনা হবে। ঘোরাঘুরির পরিকল্পনার খসড়া, তাতে আবার অগুন্তি সংশোধন। অফিসের দায়দায়িত্ব আগে ভাগে সেরে ফেলে হাত খালি করে ফেলার একটা তাড়াও থাকতো, দিন তিনেকের ছুটিকে টেনে কয়েক ঘন্টা বাড়িয়ে নিতে পারলে তো মন্দ হয় না?

পূজার মূল সৌন্দর্যটা দুই জায়গাতে। তার প্রথমটা হলো খাবারে। এ সময়ে খাবারের স্বাদও কেমন অন্যরকম লাগে, একই লুচি বারো মাস খেলেও ঠিক ওই চমকটা পাওয়া যায় না। সৌন্দর্যের কথাটা আসছে এই কারণে, এক বাড়ির খাবার মানে তো কেবল ওই বাড়ির সম্পত্তি নয়, এর ভাগ প্রতিবেশীরও। আসলে এ তো আমাদের বাঙালির চিরন্তন একটা অভ্যাস,  এখন একটু মিইয়ে গেলেও ঘরে কিছু ভালোমন্দ খাবার হলে সেটা পাশের ঘরে পাঠানোর রেওয়াজটা চিরকালের। এবং যে থালায় যাবে, সেটা খালি ফেরত দেয়াটাও অমঙ্গলের কথা। এই যে ভালোটাকে ভাগ করে নেয়ার অভ্যাস, এখনকার অনেকটা আত্মকেন্দ্রিক জীবনে কি তাকে আমরা বাতিল করে দিচ্ছি? কিংবা এসব মূল্যবান রেওয়াজ বাতিল করে দেওয়ার প্রবণতা থেকেই কি আত্মকেন্দ্রিকতাটা চলে আসছে?

আর একটা সৌন্দর্য পাওয়া যাবে আড্ডায়। পূজা মানেই পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা, বহুদিন দেখা না হওয়া আত্মীয়ের সাথে আলাপ। জীবনের তাগিদে ছড়িয়ে যাওয়া ভাই-বোন-মাসী-পিসীর সাথে কিছুটা একান্ত সময়। তাতে কিছু রাজা-উজির মেরে খানিকটা সময় উড়িয়ে না দিলে আর পূজার মজাটা কোথায়!

এ গেলো বড়বেলার পূজার গল্প। এ স্মৃতি নিকটের স্মৃতি। শৈশবের স্মৃতিগুলো আরো একটু মধুর। বাবার ঘাড়ে চড়ে প্রতিমাদর্শন, বস্তা ভরে মাটির খেলনা কিনে ঘরে নিয়ে আসা আমাদের জীবনের মধুরতম স্মৃতি। দিন যত গেছে, পূজার আবেদনের কোনো পরিবর্তন না হলেও তার উদযাপনের ঘটা ও ছটায় বদল কম আসেনি। আমাদের শৈশবের পূজায় হিন্দি গানের দাপট অতটা ছিল না, যতটা এখন হয়েছে। মাটির খেলনা তো এখন বিলুপ্তপ্রায়। বারোভাজা কিংবা ঘুগনি এখন দেখা যায় কম। পূজার সমার্থক বলতে আমরা জানতাম ঢাকের বাজনা। এখনও ঢাক আর কাসরের শব্দ না পেলে আমেজটা ঠিক জমে না, মনে হয় না যে পূজা এসেছে। আজ ভিনদেশী চটকদারি গানের দাপটে (যার অনেকটাই দুর্বোধ্য এবং অর্থহীন) আমাদের দেশী ঐতিহ্য আর পরম্পরা একেবারে বা প্রায় ভুলে যাওয়ার চর্চাটা দেখে বুকে ধাক্কা লাগে। সংস্কৃতি কোনো স্থবির জড়বস্তু নয় এবং তাকে পুরনোতে আটকে রাখা নির্বুদ্ধিতা – এ কথা মানি, কিন্তু নিজস্বতাকে সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিয়ে অন্ধের মতো পরের অনুকরণ থেকে শুভ কিছু হয় না। বাঙালির যেসব ঐতিহ্য পৃথিবীর কাছে আদৃত, তার মাঝে দুর্গাপূজা একটা। সুতরাং এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলোকে অক্ষত রাখার দায়টাও বাঙালির উপরেই আসে।

নির্লিপ্ততার কথা বলছিলাম একটু আগে। তবুও শেষ পর্যন্ত অতটা নির্লিপ্ত থাকা যাবে না, যায় না। দেশে প্রিয়জনরাও পূজার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আছে। তাদের সাথে কথা বললে, ক্ষীণ হলেও পূজার গন্ধটা যেনো আবছা করে পাওয়া যায়। আজ প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে দূরে বসেও উৎসবের চেহারাটা অন্তত দেখতে পারি। দূরকে কাছে আনাটাই তো উৎসবের সারবস্তু। এই নির্লিপ্ত অনাগ্রহ নিয়েও আমরা প্রবাসীরা পরিজনদের খোঁজ নেবো, তাদের আনন্দটাই দূর থেকে ভাগ করে নেয়া হবে। আরতির লগ্ন হলে, মন্দির থেকে ধূপের গন্ধটা যেমন নাকে এসে লাগে, উৎসবের সুবাসটাও তেমনি আমাদের গায়ে এসে আলতো স্পর্শ বুলিয়ে যাক।

স্মৃতির কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। ওটা দিয়েই শেষ করি। পূজার স্মৃতি মানে তো আদতে বাংলাদেশের স্মৃতি। শরতের স্মৃতি, মাটির গন্ধের স্মৃতি, ছেড়া ছেড়া সাদা মেঘ, কাশফুলের স্মৃতি, বন্ধুদের স্মৃতি, লুচি-বাঁধাকপি-রসগোল্লা-পাপড়ের স্মৃতি এইসব মিলেই তো দেশের স্মৃতি। দেশটা ভালো থাকুক, এই শারদীয়া তার জন্য মঙ্গলময় হোক।