দুর্গাপূজা ও আমার মেয়ে বেলা

লিখেছেন অনন্যা সাহা


আমাদের গ্রামের বাড়ির পূজো সেই চলছে আদ্যিকাল ধরেই। ঠাকুরদার আমল থেকেই চলছে এই বাড়িতে দেবী দুর্গার আরাধনা। বাবার চাকুরীর সুবাদে ঢাকার কাছে নারায়নগঞ্জ এ আমাদের বসবাস, কিন্তু পূজোর সময় শোভারামপুর যাবোনা তাই কি হয়। আর হ্যাঁ, আমাদের গ্রামের নাম শোভারামপুর। গ্রাম বললে ভুলই হবে, ফরিদপুর শহরের কাছেই যে ছিল আমার ছেলেবেলার পূজো গুলোর না হারানো অনেক স্মৃতি। কালেভদ্রে গ্রামে যেতাম আমরা, কিন্তু পূজোর সময় যাবোনা এটা হয়না। আমাদের পরিবার এর ভ্রমণ বছরে এই একটিবারই হতো, আর তা হতো মা দুর্গার আগমনে। সাধারণত পঞ্চমীর দিন আমরা গ্রামে যেতাম, আর গ্রামে যাবার পথে উম্মুক্ত পদ্মার বুকে ফেরী দিয়ে নদী পার হবার সময় ইলিশ ভাঁজা যেন ছিল একটা আশীর্বাদ। দূরে নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলোতে শরত এর কাশফুল হেলে যেতো সূর্য্যরে সোনালী আভায়, আর তখনই মনে হতো মা আসছেন।


ফরিদপুর শহর থেকেই সম্পূর্ণ পুজোর বাজার করে টেম্পোতে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আমাদের গ্রামের বাড়িতে। ঠাকুরের গয়না, বাসন থেকে শুরু করে দশকর্মার বেশিরভাগ জিনিসই যায় ফরিদপুর শহর থেকে। বাকি ফলমূল, কাঁচা বাজারটা শুধু আসে নিজেদের বাগান ও স্থানীয় বাজার থেকে। এ বাড়িতে একই কাঠামোতে পুজো হয় প্রতি বছর। বিসর্জনের পরে কাঠামো তুলে নিয়ে এসে রাখা হয় ঠাকুরদালানে। প্রতি বছর রথের দিনে প্রথম মাটি পড়ে। আর প্রস্তুতি শুরু হয় মহালয়া থেকে। প্রতি বছর পঞ্চমী থেকেই মায়ের সঙ্গে পূজোর আয়োজনে পুরোদমে থাকতাম আমি আর দিদি। বাকি আত্মীয়রা আসেন সপ্তমী থেকে। হই হই করে জমে ওঠে এই ঘরোয়া পূজো। তবে পূজোর পরিচালনা ঘরোয়া হলেও তা দেখতে কিন্তু প্রচুর মানুষ আসতেন আমাদের শোভারামপুরের বাড়িতে । গ্রামের অন্তত বিশ- ত্রিশ জন মানুষ পূজোর কাজ করেন। আর গ্রামের সবাইকে খাওয়ানো হয় বিশেষ ভোজ – খিচুড়ি, সব্জি, চাটনি-পায়েস। আমাদের পূর্বপুরুষ কেউ এরকম স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। তারপর থেকেই এই ভোগ দেওয়া শুরু হয়। মাকে ভোগ দেবার পর থেকেই ষষ্ঠী থেকেই আমরা সবাই খেতাম নিরামিষ একেবারে দশমী পর্যন্ত।

ষষ্ঠী আসতেই আমাদের গ্রামে পড়ে যেতো নতুন জামা পড়ার হিড়িক, নতুন জামা পড়ে অঞ্জলি দিতে সবাই আমাদের গ্রামের বাড়ির মন্দিরে আসতো দল বেঁধে। ষষ্ঠী আর সপ্তমীতে এভাবেই নতুন জামা কাপড় পরে ঘুরে বেড়ানো, পাশের গ্রাম গুলোতে গিয়ে গিয়ে ঠাকুর দেখা ছিল আমার সবচেয়ে পছন্দের ক্ষণ। অষ্টমী এলেই সবাই আমাদের বাড়ির মন্দিরে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে মনের ইচ্ছে পূরণের প্রার্থনা করতেন ,সাথে ছিল মহাঅষ্টমীর খিচুড়ি ভোগ। নবমী জুড়ে চলতো ভোগ, আরাধনা আর ধুনুচি নাচ। দশমীর দিন সকাল থেকেই কেন জানি বিষণœ হয়ে পড়তো মন যে মা আবার কবে ফিরে আসবে এটা ভেবে। আমাদের সাহা পরিবারের পূজোর আরও একটা আকর্ষণ হল নাড়–। পূজোর প্রসাদ হিসেবে বিপুল পরিমাণ নাড়– তৈরি হয়। থরে থরে সাজানো থাকে কাঠের বারকোশে। পূজো দেখতে এসে নাড়– প্রসাদ না খেয়ে খুব একটা কেউ ফিরে যান না। এই পূজোতে চারদিনই ঢাকের বাদ্যির সঙ্গে বসে সানাই। ইদানীং খুব কম বাড়ির পূজোতেই এই সানাই ব্যাপারটি রয়েছে। কিন্তু আমরা সেটা ধরে রেখেছি ।
দশমীতে বিসর্জন পরেই আমরা চার দিনের নিরামিষ ছেড়ে অন্ন হিসেবে মাছ খেতাম আর তারপর সবার নিজ নিজ বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি। আগে একাদশীর দিন যাত্রা হতো। আমি ছোটবেলাতেও দেখেছি যাত্রা। এখন আর সে সব হয় না। কিন্তু আমরা বাড়ির সবাই মিলে আটচালাতে জড়ো হয়ে একটা ছোট্ট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করি, আর সেই সন্ধ্যা গুলো মনে হয় এখন হাজার রাতের তারায় মিলিয়ে যাচ্ছে। সময়ের অভাবে আর আমাদের এই সময়ের প্রয়োজনে কেন জানি হারিয়ে যাচ্ছে আগের সব আনন্দগুলো। আগে পূজো শেষ হবার পরে , পরিবার এর সবাই সবাইকে সময় দিয়ে কিছুদিন গল্প-গুজব করে তারপর ফিরে যেতাম নিজ নিজ ঘরে। কিন্তু এখন আর হয়না, সময় অনেকটা বদলে গেছে, এখন পূজো অন্য রকম। এখানে, নিজ দেশ ছেড়ে এই দূর দেশে মনে হয় ইস কবে যে আরেকবার ফিরে যাবো সেই আমাদের গ্রামে যেখানে পূজোয় ছিল অনেক রঙ আর আনন্দের।