কোরিয়ায় কেমন আছেন র‌্যামিটেন্স-যোদ্ধারা

লিখেছেন মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী  

দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। কোরিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বেশ জোরালো, যার সূচনা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। সেই থেকে এ সম্পর্কের ভীত ও গভীরতা দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। কূটনৈতিক সম্পর্কের হাত ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক সময়ের সাথে জোরালো এবং টেকসই ভিতে দাঁড়িয়ে আছে। একই সাথে বেড়েছে কোরিয়া বাংলাদেশী ছাত্র-ইপিএস কর্মী ও পর্যটকদের পদচারণা।

পরিসংখ্যান বলছে, কোরিয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশীদের সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। এর মধ্যে আছেন ব্যবসায়ী, ছাত্র-ছাত্রী ও দক্ষ-আধাদক্ষ রেমিটেন্স-যোদ্ধা। দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন এমন শত জনের কোরিয়া থাকার বয়স প্রায় ২৭-২৮ বছর। অর্থাৎ বর্তমান যে উন্নত কোরিয়াকে আমরা দেখছি তার উন্নয়নের শুরুর এবং মধ্যে ভাগের সময়টাকে তারা দেখেছেন কাছ থেকে।

আজকের এ লেখায় বর্তমানে কোরিয়াতে যারা বসবাস করছেন তারা কেমন আছেন, কোরিয়া নিয়ে তাদের মনোভাব কী সেসব সম্পর্কের কিছুটা আলোকপাত করব। বর্তমানে কোরিয়ার বসবাসরত বাংলাদেশীদের তিন ভাগে ভাগ করা যায়- প্রথমত বাংলাদেশী ব্যবসায়ী সমাজ; কোরিয়ায় শ’খানেক এর মতো বাংলাদেশী ভাই-বোন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তাদের কেউ কেউ কোরিয়ান নাগরিকদের বিয়ে করে এদেশে জীবন সংসারী হয়েছেন এবং ব্যবসায় জড়িয়েছেন।

এখানে বাংলাদেশীদের ব্যবসা মোটামুটি মোবাইল শপ, রেস্টুরেন্ট, ট্রাভেল এজেন্ট, হালাল ফুড ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে। তবে কয়েকজন আছেন যারা বড় পরিসরে গার্মেন্টস, প্রযুক্তিগত পণ্য কসমেটিকস পণ্য, কেমিক্যাল পণ্য, সোলার পাওয়ার, লেদার গুডস, বাসা-অফিস সাজসজ্জা সরঞ্জাম ইত্যাদি ব্যবসায় নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়ীদের অনেকেই বাংলাদেশী ভাইদের সাথে নিয়ে বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসছেন বিনিয়োগের চিন্তাভাবনা করছেন। সাম্প্রতিককালে কিছু কিছু বাংলাদেশী ইপিএস কর্মীও উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন এবং ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের নতুন স্থাপিত বাণিজ্যিক উইং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করছে।

দ্বিতীয়ত বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রী; বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় দেড় হাজারের মতো ছাত্র-ছাত্রী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করছেন। মাস্টার্স এবং পিএইচডি স্তরে বেশীর ভাগ ছাত্র-ছাত্রী অধ্যায়নরত আছেন। কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্ব আরোপ করে থাকে। তাই এখানে যারা পড়তে আসেন তাদের পড়ালেখার পেছনে প্রচুর পরিশ্রম ও সময় ব্যয় করতে হয়। তার ফাঁকে ফাঁকেই তারা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালিয় থাকেন।

মূলত ব্যবসা প্রশাসন, আইসিটি, কৃষি গবেষণা ইত্যাদি বিষয়ে বেশীর ভাগ ছাত্র-ছাত্রী অধ্যায়ন করছেন। কোরিয়ার অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। তবে যারা কোনো ধরনের স্কলারশীপ-এর আওতায় পড়াশুনার সুযোগ পাচ্ছে না তাদের ছাত্রজীবন এখানে খানিকটা কষ্টকর। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সরকারি বর্মকর্তাগণ এখানে বিভিন্ন স্কলারশীপের আওতায় পড়াশোনা করছেন। এর বাইরে যারা পড়াশোনা করছেন তাদের অনেকেই বাংলাদেশ ফিরে গিয়ে কী ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন সে বিষয়ে বেশ খানিকটা চিন্তিত বলেও মনে হয়।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশী রেমিটেন্স সৈনিকবৃন্দ/ইপিএস কর্মী; দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশীদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আসা দক্ষ-আধা দক্ষ ইপিএস কর্মীদের সংখ্যাই এখন সবচেয়ে বেশী। এর সংখ্যা প্রায় ১৩০০০ এর কাছাকাছি। ৮০’র দশক থেকে বাংলাদেশী কর্মী ভাইয়েরা কোরিয়ার উন্নয়ন অভিমুখী যাত্রায় তাদের শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।

সর্বশেষ ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশী শ্রমিক দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের Employment Permit System (EPS) এর আওতায় জিটুজি ভিত্তিতে বিভিন্ন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ধাপ পেরিয়ে কোরিয়ার শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। এ শ্রমবাজারে তারা যুক্ত হচ্ছেন নির্মাণ শিল্প, ফার্ণিচার কারখানা, জাহাজ শিল্প, প্লাস্টিক পণ্যের কারখানা, রি-সাইক্লিং শিল্প, আইটি শিল্পসহ বহুবিধ উৎপাদন মুখী শিল্প কারখানায়। কর্মী হিসাবে কোরিয়া শিল্প মালিকদের কাছে বাংলাদেশীদের সুনাম আছে। তবে ইদানীং ঘন ঘন চাকরি-বদল, খাদ্যাবাস সংক্রান্ত জটিলতা ইত্যাদি কারণে অনেক বাংলাদেশী কর্মী কিছুটা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থার প্রভাব এবং সরকারী শ্রম আইনের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প মালিক পক্ষ বেশ কিছুটা চাপের মুখে আছেন-যার কারণে শ্রমিকদের উপরও চাপ বাড়ছে। তাই এসময় বাংলাদেশী কর্মীদের চাকরি ছাড়ার চিন্তা মাথা থেকে দূর করা জরুরি, কেননা একবার চাকরি ছাড়ার পর আরেকটি চাকরি পাওয়ার সুযোগ এখন খুবই কম। প্রবাস জীবনে শত ব্যস্ততার মাঝেও তাঁরা বিভিন্ন উৎসব, অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, বনভোজন ইত্যাদির আয়োজন করে থাকেন।

সবশেষে সার্বিকভাবে বলা যায়, কোরিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশীরা অন্যান্য অনেক দেশের বিবেচনায় বেশ ভাল অবস্থায় আছেন। উন্নততর প্রযুক্তি, দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্বাস্থ্যপ্রদ জীবন যাপন, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা সব মিলিয়ে এখানে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের সময় বেশ ভালই কাটছে।

লেখক : কাউন্সেলর, (বাণিজ্য উইং), সিউল, বাংলাদেশ দূতাবাস