আগুনে নিহত স্ত্রীর লেখা শেয়ার করলেন দুদক পরিচালক

স্ত্রী তানিয়া আগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন সম্প্রতি। স্ত্রীর সাথে রয়েছে অজস্র স্মৃতি। সেই স্মৃতি উঁকি দিয়ে যায় মনের দরজায়। গতরাতে স্ত্রী তানিয়ার একটি লেখা শেয়ার করলেন দুদক পরিচালক।
দুদক পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফের স্ত্রী তানিয়া ইশরাতের লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো :-
দীর্ঘ আঠারো বছর পূর্বের কথা। আমি তখন আঠারো বছরের তরুণী, রূপ লাবণ্য না থাকা সত্ত্বেও ডজনে ডজনে প্রেম প্রস্তাবে হিমশিম খাওয়া অবস্থা। এ সময় প্রেম প্রস্তাব এল এমন একজন থেকে যার জন্য আমি কোনভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। তার ব্যাকুলতা আমাকে ক্রমশঃ দুর্বল করতে থাকে। এক পর্যায়ে মনে হলো এর চেয়ে বেশি আমাকে কেউ ভালোবাসতে পারবেনা। তাই মনঃস্থির করলাম এবং সম্মতি জানালাম। পরদিন বিয়ে করলাম। শর্ত ছিল, কেউ জানবেনা।
কিন্তু দিন পনেরো প্রেম করার পরই পরিবারে জানাজানি। পারিবারিক, সামাজিক অনেক নাটকীয়তার পর আমি পরাস্ত হলাম এবং পরিবারের সিদ্ধান্তে প্রথম বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় আবার বিয়ের পিড়িতে বসলাম। দ্বিতীয় বিয়ের পর মনে হলো “আল্লাহ যারে দেয় ছাপ্পার ফারকে দেয়”।
মন মানসিকতা স্থির করে দাম্পত্য জীবন একটু একটু করে শুরু করলাম। প্রতিদিন স্বামী খ্যাত প্রেমিকটির চরিত্র ও বৈশিষ্টের সাথে পরিচিত হতে থাকলাম। বঞ্চিত হব তার চরিত্রের অংশবিশেষ সবার সাথে শেয়ার করতে না পারলে। যেমন, আমার এবং আমার মায়ের স্যান্ডেল পরে ইউনিভার্সিটি যাওয়া এবং টের না পেয়েই ঘরে ফেরা। উল্টো জামা-গেঞ্জি পরে সারাদিন কাটানো এসব সাধারণ বিষয়ে রূপ নিতে লাগলো। সিগারেট একমাত্র সঙ্গি, রাত তিনটায় সিগারেট শেষ হয়ে গেলে রাস্তার টং দোকান খুজে সিগারেট বের করে আনা নতুন কিছু না।
তার চাকরি জীবনে এসে আমারা সংসার শুরু করি। তাতেও তার নানান সফল কীর্তি। কোনদিন বাজারে পাঠালে পঁচা মাছ, সব্জী সব আমার বাসায়। বিয়ের আগে কে কিনতো জানিনা, বিয়ের পর হতে কখনো নিজের রেজারটাও নিজে কেনেনি। এণ্ডলো আমাকেই করতে হয়। খুব খুশি হতাম এই ভেবে যে, আমার স্বামী আমার পছন্দের এত কদর করে! কিন্তু ভুল ভাঙ্গলো একবার কক্সবাজার গিয়ে। একটা ব্র্যান্ড শপে তার সব জিনিষ যখন আমিই কিনছি, তখন সে নিজে তার জন্য একটা প্যান্ট পছন্দ করলো। আমার আপত্তি উপেক্ষা করে প্যান্ট ট্রায়াল দিল এবং কিনে নিল। আমি কিছুটা মনক্ষুন্ন এই ভেবে যে, লোকটা কি পছন্দ করতে শিখে গেল?
বাসায় ফেরার পর পরতে গিয়েই বিপত্তি। সমস্যা খুজতে গিয়ে আবিস্কার করলাম, ওটা একটা লেডিস প্যান্ট। তারপর হতে বেচারা নিজের সু কেনার সময়ও বলে “তোমার পায়ের মাপে আনলেই হবে।”
একদিন সে অফিসে যাওয়ার পর ঘর গোছাতে গিয়ে তার সু মেলাতে পারছিলাম না। একটা কালো অন্যটা ব্রাউন। তাৎক্ষনিক ফোন করলাম “হ্যালো, কি বস সামনে? পায়ের দিকে তাকাও।” এরকম ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। বাথরুমে দুই বছর যাবৎ একই ব্র্যান্ডের বডি ওয়াশ, তারপরও এক সকালে আমার স্বামী “তানিয়া বথরুমে সাবান নেই”। আমি বললাম “সাবান নেই মানে, সাবান তো আছে”। “আরে খুজে দাওনা” এরূপ আকুতিতে উঠে গিয়ে দেখি কাপড় কাচার হুইল সাবানের কেইসটা জানালার উপর নেই!!
শীতে ক্রিম-লোশন লাগানোর তাগিদ দিতাম প্রায়। এক সকালে স্বামী অফিসের জন্য স্যুট-বুট পরে আয়নার সামনে শেষ প্রস্তুতি সারছে, মুখে ক্রিম মাখছে। আমি দৌড়ে এসে হাত থেকে ক্রিমটি টেনে নিলাম। অবাক চোখে স্বামী তাকিয়ে। আমি বললাম
“এটা হিল ক্র্যাক ক্রিম”। সে বলল “আমি তো প্রতিদিন এটাই লাগাই”।
এরকম প্রতিনিয়ত সে আমাদের নতুন কিছু না কিছু উপহার দিয়ে যাচ্ছে এখনো! শুরু থেকে চেষ্টা ছিল তার বৈশিষ্ট্যকে কিছুটা পরিবর্তনের। আমার রূপণ্ডণ বলে তেমন কিছু নেই, তবুও স্বামীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যেতাম। যেমন, সকালে কোমর পর্যন্ত চুল আর সন্ধ্যায় বয়কাট, স্বামীর দৃষ্টিতে পড়লোনা। সকালে শার্ট প্যান্ট আর সন্ধ্যায় সনাতন গ্রাম্য বধু, স্বামীর দৃষ্টি পড়লোনা। মাঝে মাঝে মনে হতো আমার জায়গায় অন্য কাউকে বদল করে দেখি, দৃষ্টি পড়ে কিনা! কিন্তু সে সাহস কখনো হয়নি। মনে হতো একবার যদি দৃষ্টি পড়েই যায়ৃ.!

আমার এ দীর্ঘ প্যাচালের পর ক্লিয়ার করছি যে, আমার সেই ব্যাকুল প্রেমিক প্রথম স্বামীই আমার দ্বিতীয় স্বামী। ছেলেদের বিয়ের আগের আর পরের রূপ কখনো এক হয়না। কোনদিন হবেও না। তারুণ্যের শুরুতে ভালোবাসি বলা অনেক সহজ। যৌবনের শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে বলা অনেক কঠিন। কারণ এ পর্যায়ে ভালোবাসা হয় মৌহহীন আবেগহীন স্বচ্ছ কাচের মত।

আমরা যদি আবারো জন্মাই, তুমি কাউকে না পেলে আমার কাছে এসো, আমি সবাইকে ছেড়ে তোমার কাছেই যাবোৃ..। কথা দিলাম।

-বউ
(২০১৩)

উল্লেখ্য, গত বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরায় নিজেদের বাসায় আণ্ডনে দগ্ধ হন তিনি। তৎক্ষণাৎ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হলে বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে তানিয়ার মৃত্যু হয়। জানা গেছে, তানিয়া ইশরাত মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। এর আগেও তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এ নিয়ে তানিয়া ইশরাতের পরিবারের কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।