দুদকের চোখে পর্দা

ক্যাসিনোর চড়কা ঘুরছে। জুয়ার টাকা উড়ছে। লাখ লাখ, কোটি কোটি টাকা। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে আলো-আঁধারির রহস্যময় পরিবেশে বছরের পর বছর ধরে চলে টাকার ওড়াওড়ি। ক্লাবপাড়ার বাইরে ব্যস্ততম নগরীর
রুফ টপ, এমনকি পাড়া-মহল্লার পাচিল ঘেরা সুরক্ষিত বাড়িতে রাতভর চলে প্রকাশ- গোপন ক্যাসিনো। মসজিদের শহরে ক্যাসিনো-চড়কার ঘূর্ণন থামে ফজরের আজানের পর। ভোরের আলো ফোটার আগ মুহূর্ত চলে অবৈধ ক্যাসিনোর আসর। চলে কড়কড়ে টাকার উন্মুক্ত বিলি-বণ্টন। এ অর্থের উৎস কি? কারা আনে এ অর্থ? এ অর্থ যায়ই বা কোথায়? নগদ অর্থের এই নাঙ্গা উৎসবে কোনোদিন হায়না দেয়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নামক দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি। কোনো দিন প্রশ্ন তোলেনি এ টাকা বৈধ কি অবৈধ। কারা এ টাকা ওড়ায়, কোথায়, কার পেকেটে যায়। জুয়ার লব্ধ কোটি কোটি টাকার শেষ গন্তব্যই বা কোথায়? দুদক এতোদিন তাহলে কি করেছিলো- এই প্রশ্নই এখন বড় করে দেখা দিয়েছে জনমনে। প্রশ্ন উঠেছে দুদকের দায়িত্বশীলতা নিয়ে। প্রতিষ্ঠানটির যৌক্তিকতাও উঠে আসছে প্রকারন্তে। এতোদিন কোথায় ছিলেন দুদক?

র্যাব-পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মতোই চোখে ঠুলি পরেছিলো দুদক নামক প্রতিষ্ঠানটি। নাকের ডগায় এমন নগদ টাকার মচ্ছব চললেও কোনোদিন দুদকের কোনো ‘এনফোর্সমেন্ট টিম’ সদুদ্দেশে একবার উঁকিও দেয়নি। অথচ র্যাব-পুলিশ-বিএফআইইউ’র মতো প্রতিষ্ঠানণ্ডলো যেই না ‘ক্যাসিনো ক্যাসিনো’ বলে সমন্বরে চিৎকার দিয়ে উঠেছে- ঠিক তখনই অন্যদের দেখাদেখি দুদকও অস্ত্রে শান দিচ্ছে ক্যাসিনো-আখড়ায় হানা দেয়ার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ক্যাসিনো-বিরোধী অভিযানে নেমেছে। সকল বাহিনী একযোগে ক্যাসিনো উচ্ছেদে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দুদকও অচিরেই মাঠে নামবে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

দুদকের একাধিক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, সংস্থাটি সব সময়ই ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’র ইচ্ছা-অনিচ্ছায় পরিচালিত হয়েছে। আইন ও বিধি-বিধানের পরবর্তে ম্যানেজমেন্টের ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষার ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। এ আকাক্সক্ষার বশবর্তী হয়ে গত সাড়ে ৩ বছর ধরে দুদক ব্যস্ত ছিলো ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, মানববন্ধন, শিক্ষার মানোন্নয়নে উপদেশমূলক চিঠিপত্র প্রেরণ, দোকান-পাট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হানা দেয়া। বেনামী অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবসায়ীদের তলবি নোটিস, জিজ্ঞাসাবাদের নামে হয়রানি, সম্মানহানি, মিডিয়া ট্রায়াল, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে। এই ফাঁকে প্রকৃত দুর্নীতিবাজরা ব্যাংক লুট করেছে। সরকার দলীয় লেবাস গায়ে দিয়ে জি.কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভুইয়া আর শফিকুল ইসলামরা হাতিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা। ব্যাংক ফতুর করেছে। রিজার্ভ চুরি করেছে। খনির পাথর-কয়লা ‘উধাও’ করেছে। অথচ দুদকের রয়েছে প্রকৃত দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আইনগত অসীম ক্ষমতা।

দুদক চেয়ারম্যান, সচিব এবং তথ্য কর্মকর্তা ব্যতিত অন্য কর্মকর্তাদের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা। তাই নাম প্রকাশ না করে সংস্থার একজন পরিচালক জানান, এইসব ক্যাসিনোওয়ালা এবং টেন্ডার কিংদের অনায়াশে পাকড়াও করতে পারতো দুদক। দুদকের রয়েছে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪’ এর ২৬(২), ২৭ (১) এর মতো ব্যাপক এখতিয়ার সম্পন্ন একটি ধারা। শত শত কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে যেসব সরকারি কর্মকর্তারা জি. কে. শামীমের প্রতিষ্ঠানকে হাজার হাজার কোটি টাকার টেন্ডার পাইয়ে দিয়েছে, কার্যাদেশ দিয়েছে, বালিশ কান্ড-পর্দা কান্ডে সহায়তা করেছে- তাদের শায়েস্তা করতে দুদকের হাতে ছিলো ১৯৪৭ সালের ২ নং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা। এ ধরণের বহু ধারা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এছাড়া শত শত কোটি টাকার টেন্ডারের জন্য জমা দেয়া ডকুমেন্টে যে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে- সে সব নিয়ে কাজ করার এখতিয়ারও দুদকের ছিলো। এছাড়া প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের অর্থ পাচারের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা নিয়ে অন্যান্য অর্থ পাচারের অনুসন্ধানের এখতিয়ারও প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে। এসব কোনো কিছুই প্রয়োগ করেনি দুদক। বরং ভূমি অফিসের অবৈতনিক উমেদার, তহশিলদার, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কেরানীকে ৫/১০ হাজার টাকার ঘুষসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করে সস্তা বাহবা নেয়ার নেশায় বুঁদ থাকছে প্রতিষ্ঠানটি। স্বল্প আয়ের সরকারি কর্মচারী, দুর্বল ও সহকর্মীদের দ্বারা কোণঠাঁসা কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠি দ্বারা একতরফা নেতিবাচক প্রচারণার শিকার ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এক পেশে সংবাদ ধরে খুচরা কাজের পেছনে দৌড়িয়ে অর্থ ও সময় অপচয় করে সংস্থাটি। পেশাদারিত্বের ধার না ধেরে ব্যক্তি, গোষ্ঠি কিংবা মহল বিশেষের প্রতিপক্ষ শায়েস্তার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারলে ধন্য হয় দুদক। দুর্নীতির প্রমাণ পেলে কাউকে ছাড়া হবে না- ধাচের বাগাড়ম্বর করে মাঝে মধ্যেই স্বীয় অস্তিত্বের জানান দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ক্যাসিনোতে প্রকাশ্যে কোটি কোটি টাকার নগদ লেনদেন দুদকের চোখে পড়ে না। কিন্তু অক্লান্ত পরিশ্রমে তিল তিল করে গড়ে তোলা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মালিকের সম্পদ অনুসন্ধানের নামে তলবি নোটিস, জিজ্ঞাসাবাদ এবং সেটি সংবাদ মাধ্যমে চাউর করার ক্ষেত্রে দুদকের জুড়ি মেলা ভার। ‘গোপন’ অনুসন্ধানেও স্বচ্ছতার নামে সৃষ্টি করা হয় তান্ডব। তফসিলভুক্ত অপরাধের দিকে মনযোগ না দিয়ে প্রতিরোধের নামে লঞ্চ ট্রেনের টিকিট কাউন্টারে ‘দুর্নীতিবিরোধী’ মহড়া, খাদ্য ভেজালকারীকে ধরে ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে তুলে দেয়া, বালু মহালে হানা দেয়ার মতো হাস্যকর চর্চায়ও নিয়োজিত থাকতে দেখা যায় দুর্নীতি বিরোধী একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিকে।

দুদকের একজন অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিচালক বলেন, এসব দুদকের মূল কাজ নয়। দুদক তফসিলভুক্ত অপরাধের দোহাই দিয়ে আর যা-ই বলুক খালেদ, জিকে শামীমদের অর্থলোপাটের দায় এড়াতে পারেন না। খোদ প্রধামন্ত্রীর নির্দেশে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান চলমান রয়েছে। এ অভিযান দুদকের আরো আগেই চালানোর কথা। নামেনি। এখনো অপেক্ষায় ‘অদৃশ্য নির্দেশনা’র। নির্দেশনা এলেই দুদক মাঠে নামবে বলে জানা গেছে।

দুদকও অভিযানে নামছে কি না- জানতে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি এখনই কোনো মন্তব্য করবেন না বলে তারপক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়। এদিকে অবৈধ অর্থের অবাধ লেনদেনের ঘটনায় দুদক দায় এড়াতে পারে কি না-জানতে চাওয়া হলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ‘ইনকিলাব’কে বলেন, আইনত: সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কিংবা তথ্য পাওয়ার আগে দুদকের অ্যাকশনে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এখন অনেক তথ্য বেরিয়ে আসছে। দুদক অ্যাকশনে যেতে পারে। ক্যাসিনোর মাধ্যমে কারা অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, কারা এণ্ডলোর নিয়ন্ত্রক, কারা বেনিশিয়ারি-তাদের বিরুদ্ধে দুদক এখন আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব ক্যাসিনো নিয়ে আগেও কোনো কোনো গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। দুদক তখন তো সেটি আমলে নিয়ে কাজ শুরু করতে পারতো। সেটি কি তারা করেছে ?