ছয় প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করছি

প্রায় তিরিশ বছর ধরে গানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন আসিফ ইকবাল। ছয় প্রজন্মের সঙ্গে গানের কাজ করছেন। অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গানের বাণী উপহার দিয়েছেন। জীবন ধারণের জন্য করপোরেট জীবনে থাকলেও আত্মার শান্তির জন্য গানের বাণী রচনা করেন। গানকে ভালোবেসে গড়েছেন গানচিল মিউজিক নামের প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে ঝুম, লোকাল বাস, বেয়াইনসাবের মতো শ্রোতাপ্রিয় গানের ডিজাইন করেছেন। আসিফ ইকবালের গানের বাণী রচনার জীবন, বর্তমানের গান, গানের ভবিষ্যৎসহ অনেক কিছু ভেতর থেকে তুলে এনেছেন রাফি হোসেন

রাফি হোসেন : গীতিকার নাকি করপোরেট চাকুরে, নিজের কোন দিকটাকে তুলে ধরতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

আসিফ ইকবাল : একটা সময় মনে হতো গানটা হচ্ছে আত্মার জন্য আর চাকরি পেটের জন্য। দুটো জায়গার জন্য সময় বের করা এবং শেখা সত্যিই কঠিন। যা-ই হোক, আমি দুটো বিষয়ের জন্যই সময় বের করতে পেরেছি। অর্জন করেছি বলতে পারি না। সেটা আপনারা বলতে পারবেন অর্জন কতটা করতে পেরেছি। আমি শুধু আমার প্রচেষ্টাটুকুই বলতে পারি। আমি অনেক সময় অনেক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছি। তখন ভেবেছি, যদি আমার করপোরেট জীবনটা ছেড়ে দিতে পারতাম তবেই ভালো হতো। কিন্তু তা পারিনি। আমি ২০১০-এ আবার করপোরেট জীবনে ফিরে আসি জীবিকার তাগাদায়। কিন্তু তাই বলে গান ছাড়িনি। ঝুম, লোকাল বাস, বেয়াইন সাবসহ অনেক গানের ডিজাইন আমার করা।

রাফি হোসেন : বাংলাদেশের সংগীত নিয়ে অনেকের ভেতরেই আশঙ্কা কাজ করছে, এটি ঠিক টিকতে পারবে কিনা। আপনি কী মনে করেন?

আসিফ ইকবাল : যতদিন একটা ইন্ডাস্ট্রি থাকবে, ততদিন গান থাকবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে চলবে। যেটা এরই মধ্যে আমরা সবাই দেখতে পারছি। সামনে এ অবস্থা আরো বাড়বে। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই দেখবেন সিনেমাকে কেন্দ্র করে গান দাঁড়িয়ে আছে। অল্পসংখ্যক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশে সংগীত একা আলাদাভাবে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে। সংগীত একটা বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়াতে মানুষের অভ্যাসে পরিবর্তন এসে গেছে। আগে মানুষ ক্যাসেট বা সিডিতে গান শুনত, তা এখন মোবাইলে জায়গা করে নিয়েছে। ইন্টারনেটের গতি বেড়ে যাওয়ার পর দেখার জায়গাতেও সবার আগ্রহ বেড়েছে। বলতে পারেন মিউজিক ভিডিওসহ একেকটা গান ছোট সিনেমার মতো হয়ে গেছে।

আমি গত ৩০ বছর ধরে এ অঙ্গনে আছি। এ সময়ে ৬টা প্রজন্মের সঙ্গে আমি কাজ করেছি। যখন প্রথম গান লেখা শুরু করি, তখন গীতিকারদের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছেন কাওসার আহমেদ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম বাবু। সিনেমায় বললে রফিকুজ্জামান, মাসুদ করিম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের গান শোনার রুচি বদলেছে। আমি দেখলাম একটা সময়ে আমার ছেলে-মেয়ে আমার গান শুনছে না। তাদের কী ধরনের গান পছন্দ, সেটা আমি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা একটা বিষয় ভুলে যাচ্ছি, তা হলো আমাদের এ গানগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে। সময় পরিবর্তন হচ্ছে, একই সঙ্গে এ গানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। আমার কাছে ভয়ের জায়গা এটাই।

আগে গান-বাজনা ছিল একটা গ্রুপ ওয়ার্ক। এখন তা নেই। এখন গান-বাজনা হয়ে গেছে স্বকীয় কর্মের স্থান। টিম থাকলে তখন অনেকের ধারণা নিয়ে

জিনিসটা আরো সুন্দর হতো। এখন একজন মানুষ সব করছে। যখন একজন মানুষ সব করছে, তখন তার কাজের ভেতরে অনেক মানুষের অনুভূতি আসছে না। একটাই অনুভূতি নিয়ে সে কাজ করছে। সৃষ্টিশীল বৈচিত্র্যের অভাব পুরোপুরিভাবেই এখনকার কাজে দেখা যাচ্ছে। আমি গান নিয়ে একটা বই লিখছি, যার জন্য অনেক গবেষণা করছি।

আমরা আরেকটা জিনিস মিস করছি। যারা পাবলিক শো করছে, তাদের গান শুনে শুনেই একটা জেনারেশন বড় হয়। তাদের এ গানগুলোই শ্রোতাদের আকর্ষণ করতে পারে, ধরে রাখতে পারে।

রাফি হোসেন : প্রযুক্তির কারণে গান এখন আর শুধু শোনার বিষয় না, দেখারও বিষয়। অনেকে হয়তো ভালো গান করছে। কিন্তু আর্থিক কারণে সেটার মিউজিক ভিডিও বানাতে পারছে না বলে সবাই সেটাকে নিচ্ছে না। তাহলে এমন শিল্পীরা কীভাবে উঠে আসবে?

আসিফ ইকবাল : এটা খুব বড় ব্যাপার না। কারণ মানুষের ভালোলাগার মতো গান তৈরি করলে তা এক সময় মানুষের কাছে পৌঁছাবেই। কিছুদিন আগে একটা ছোট ছেলের ‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’ গানটা তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এভাবেই হয়ে যায় অনেক গান হিট। কিন্তু সেগুলোতে দুবছর পর হারিয়ে যাবে। দীর্ঘ সময়ের জন্য বা সময়হীনভাবে চলার মতো গান তৈরি হচ্ছে না, সেটাই আসল শঙ্কার বিষয়।

রাফি হোসেন : এমন গান তৈরির জন্য কী করা যেতে পারে?

আসিফ ইকবাল : এর জন্য চেষ্টা করতে হবে, গানের প্রতি মনোসংযোগ বাড়াতে হবে। অসীম সময়ের জন্য গানগুলো তৈরির জন্য চিন্তা করতে হবে, সেভাবে গান বানাতে হবে। এখন সময়ের সঙ্গে চলার জন্য গান তৈরি হচ্ছে। কেউ হিন্দি গানের মতো গান করছে, কেউ ইংরেজি গানের মতো গান করছে। এগুলোকে অনুসরণ করে আমরা গান করছি, কারণ এগুলো এখন সমসাময়িক ধারায় চলে আসছে। দেশাত্মবোধক গান, কোথায়? নেই। গত ১০-১৫ বছরে একটা ভালো দেশাত্মবোধক গানের কথা আমাকে বলেন। অথচ একটা সময় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ অনেক অসীম সময়ের গান তৈরিতে প্রেরণা দিয়েছে। কিছুদিন আগেই হলি আর্টিজেনের মতো একটা ঘটনা হয়ে গেল, অথচ এর পরিপ্রেক্ষিতে একটা ভালো গান এলো না।

রাফি হোসেন : তাহলে কি সেই হিসাবে সত্যিকারের শিল্পী এখন নেই?

আসিফ ইকবাল : হয়তো আছে কিন্তু আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। এখন কোন জনরার হিসেবে গান নেই, কোন জনরাতে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার প্রবণতা নেই। সবাই শুধু দর্শকপ্রিয়তার হিসেবে গান করছে। আমাদের দেশে ব্যান্ড মিউজিকটা নষ্ট হয়ে যাওয়াতে বিশাল বড় ক্ষতি হয়েছে। ইসলামিক ধারণা দিয়ে কিছু আক্রমণ হওয়ার ফল হিসেবে ব্যান্ড মিউজিক নষ্ট হলো। এটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রায় হারিয়ে গেল। এখন আর মানুষ ব্যান্ড মিউজিক শোনে না। মানুষকে তো উপভোগ করতে দিতে হবে, আনন্দের দিকে তাদের নিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশের এখন বড় সমস্যা মাদক। এ মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে গান এবং খেলা। আমাদের দেশের মানুষ অনেক পরিশ্রম করতে পারে এবং তারা অনেক সৃজনশীলও। কিন্তু তা কেন যেন বিস্তৃত হচ্ছে না। এখানে সবাইকে বলা হয় কাজ করতে। তাদের কাজ শুধু কাজ করা, সৃষ্টিশীল কিছু করার জন্য সময় পায় না।

রাফি হোসেন : বেঙ্গলের ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক ফেস্ট আমাদের সংগীতে কতটা জায়গা তৈরি করতে পারে?

আসিফ ইকবাল : এটা একটি ভালো উদ্যোগ। অনেক মানুষের আগমন দেখে এটা আমাদের দেশের সংগীতের জন্য ভালো হবে বলেই মনে করি। কিন্তু কেন যেন আমার কাছে মনে হয়, এ উদ্যোগটা যতটা লোক দেখানোর জন্য দর্শক ব্যবহার করছে, ততটা ঠিক সংগীতের জন্য ব্যবহার করছে না।

রাফি হোসেন : শুনতে শুনতে কান তৈরি হওয়ার একটা ব্যাপার তো আছে।

আসিফ ইকবাল : সেটা হবে তখন, যখন আপনি সারা বছর ধরে এটা শুনতে পাবেন। আপনি তো সারা বছর ধরে এটা পাচ্ছেন না। পাচ্ছেন বছরে একবার।

রাফি হোসেন : তাহলে সংগীতটা কীভাবে এগোবে?

আসিফ ইকবাল : এ বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে কথা বলতে হবে। তাদেরকে এ জিনিসগুলো দেখাতে হবে। তাদেরকে বলতে হবে কী করলে আরো ভালো কিছু হবে। এটা যে শুধু সরকারকে করতে হবে তা নয়। মিউজিক হাউজ, মিউজিক প্রডিউসার, পত্রিকা, টেলিভিশন সবাইকে এ উদ্যোগ নিতে হবে। আমি বিশ্ব নিয়ে কাজ করছি। গানচিলে গান পাকিস্তানে কাভার হচ্ছে, ভারতের এসভিএফ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষ আছে। এর অর্থ ২ কোটি গ্রাহক আছে আমাদের। আর কয়টা ভাষায় আছে এমন সুযোগ। আমাদের থাকার কথা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। গানচিল সেই কাজটি করে যাচ্ছে। গানচিলের অনেকগুলো গান পাকিস্তানে কাভার হয়েছে। আমাদের গানের সঙ্গে সঙ্গে এর মিউজিক ভিডিও নিয়েও আমরা কাজ করি। সেটাও আমাদের দেশের সংস্কৃতি থেকেই আসে। মার্কেটিংয়ের কিছু বেসিক ব্যাপার মাথায় রেখেই আমি কাজ করি। ও ছেড়ি ও ছেড়ি টাইপের গানের কাজ করার অফার আমার কাছেও আসে। কিন্তু আমি তো সেগুলো করব না। কারণ আমি গানের   স্রোতে পরিবর্তন আনার জন্য কাজ করছি।

রাফি হোসেন : গান নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?

আসিফ ইকবাল : আমি আমাদের দেশের গানকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছি। কোনো সস্তা প্রচারণার দিকে না ঝুঁকে দেশকে, দেশের গানকে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয়ে কাজ করছি।