বিদেশে গিয়ে পুকুর খনন শেখা!

লিখেছেন সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

বাংলাদেশে রাজনীতিরে নানা সমীকরণ আর ঘাত প্রতিঘাতের খবরের বাইরে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ উন্নয়ন। সরকার দাবি করে, আমরাও বলে চলেছি। এবং এর কিছু বাস্তব কারণও আছে। আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, আমাদের মাথাপিছু আয় সারা বিশ্বে আলোচিত। কিন্তু কিছু খবর আমাদের সামনে প্রশ্ন তুলে দেয়– সত্যি কি আমরা উন্নতি করছি? যেমন একটি খবর এখন বেশ আলোচিত- বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ১৬ কর্মকর্তা পুকুর খনন শিখতে বিদেশ যাচ্ছেন। আমাদের প্রকৌশলী আর কর্মকর্তাদের যদি পুকুর খনন শিখতে বিদেশ যেতে হয় তাহলে উন্নয়নটা হল কোথায়?

আসল কথা হল দুর্নীতি। একটা প্রকল্প দেখিয়ে বিদেশ সফর হল, বেশ বড় অংকের টাকাও পকেটে ঢুকল। এমনই আরেকটি খবর হল সাড়ে ৫ হাজার টাকা দামের একটি বই স্বাস্থ্য অধিদফতর কিনেছে ৮৫,৫০০ টাকায়। গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজের জন্য একটি সার্জারি বইয়ের ১০টি কপি কিনেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বইটির বাজারমূল্য সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা হলেও স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রতিটি বই কিনেছে ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা করে। সেই হিসাবে ১০ কপি বইয়ের মোট দাম পরিশোধ করা হয়েছে ৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।

 একটা সময় ছিল যখন দুর্নীতি থেকে মুক্ত থেকে সাহস করে সমাজে অবস্থান করা মানুষদের সম্মান ছিল। এমনকি খোদ দুর্নীতিবাজরাও তাদের সমীহ করে চলত। এখন আর সে অবস্থা নেই। দুর্নীতি মুক্ত মানুষ মেলা ভার আর যদি থাকেও তার জন্য অসন্মান আর অবহেলা অপেক্ষা করে সমাজের স্তরে স্তরে। 

অর্থাৎ, বাজার দামের তুলনায় ৮ লাখ টাকা বেশি খরচ করে এ বই কিনেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। শুধুমাত্র এই একটি আইটেমের বই-ই নয়, দুটি টেন্ডারে ৪৭৯টি আইটেমের ৭ হাজার ৯৫০টি বই কিনেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এসব বইয়ের মূল্য বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৬ কোটি ৮৯ লাখ ৩৪ হাজার ২৪৩ টাকা। এ বছরের ১৯ জুন টেন্ডার দুটির ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হাক্কানী পাবলিশার্স। তারাই বাজার থেকে বইগুলো কিনে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে সরবরাহ করেছে।

অতি সম্প্রতি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বালিশ কাহিনী, সিলেটের এক কারা কর্মকর্তার বাসায় ঘুষের ৮০ লাখ টাকা পাওয়া, স্বাস্থ্য বিভাগের চতুর্থ শ্রেণির আবজল দম্পতির দেড় হাজার কোটি টাকার সম্পদের কথা মিইয়ে যেতে না যেতেই পুকুর খনন আর এই বই কাহিনী সামনে এল। আর আমরাতো ভুলেই গেছি বেসিক ব্যাংক লোপাটের কথা, সোনালি ব্যাংকের প্রায় চার হাজার কোটি টাকার হলমার্ক কেলেংকারীর কথা। আমাদের শাসন ব্যবস্থা যারা পরিচলনা করেন তারা দুর্নীতি বিরোধী অনেক প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু বাস্তবতা হল বিশ্বের চরম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান বেশ পাকাপোক্ত। হয়তো রোল নাম্বার এদিক সেদিক হয় বিভিন্ন বছরে।

গণমাধ্যমে উঠে আসছে, টেলিভিশনে টকশো হচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে হৈ চৈ হলেও, একটা কথা মেনে নিতে হবে যে, দুর্নীতি নিয়ে আমাদের চার দিকের যে সমাজ, তার মাথাব্যথা দিন দিন নিম্নমুখী। অর্থাৎ দুর্নীতি গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। এবং এটাই আসলে দুর্নীতিবাজরা চায়। এখান থেকেই অনেকগুলো প্রশ্ন ওঠে। একটা কথা বলে দেয়ার বা গেলানোর চেষ্টা হয় কোন কোন মহল থেকে যে উন্নয়ন হলে দুর্নীতি হবেই। বিষয়টা কি আসলেই তাই যে, উন্নয়ন আর দুর্নীতিকে হাতে হাত ধরেই পথ চলতে হবে? সারাজীবন শুনে এসেছি সামরিক শাসন থাকলে দুর্নীতি বাড়ে। প্রশ্ন হল নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের আসলে দুর্নীতি কেন বাড়বে?

বড় পত্রিকা বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম ফেসবুকে লিখেছেন এসব খবর আর লিখতে ইচ্ছা করেনা, আর লিখেই বা কি লাভ, কোন প্রতিকারতো হচ্ছেনা। এই আক্ষেপ স্বাভাবিক নয়। আমার ধারণা একটি গোষ্ঠী ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে এই প্রক্রিয়াটিই সম্পন্ন করছে। তারা চাচ্ছে দুর্নীতি তারা করে যাবে, কিন্তু সেটা মেনে নিতে হবে। দুর্নীতি সম্পর্কে সমাজের নৈতিক অবস্থান বা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেয়ার খেলায় মত্ত তারা। এর কোনও দীর্ঘস্থায়ী খারাপ ফল আছে কিনা সেটাই এখন বিবেচ্য বিষয়।

অফিসে, আদালতে, ব্যবসা বাণিজ্যে, এমনকি পেশাজীবীদের মধ্যে একটা সংস্কৃতিগত পরিবর্তন আসছে। একটা সময় ছিল যখন দুর্নীতি থেকে মুক্ত থেকে সাহস করে সমাজে অবস্থান করা মানুষদের সম্মান ছিল। এমনকি খোদ দুর্নীতিবাজরাও তাদের সমীহ করে চলত। এখন আর সে অবস্থা নেই। দুর্নীতি মুক্ত মানুষ মেলা ভার আর যদি থাকেও তার জন্য অসন্মান আর অবহেলা অপেক্ষা করে সমাজের স্তরে স্তরে। অবস্থাটা এমন- যেন তেন প্রকারে অতিমাত্রায় রোজগার না করতে পারলে নিজের পরিবারের মানুষজনও তাকে মর্যাদা দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে।

এটাই চক্রান্ত। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে থাকা জনসেবকরা জনগণের টাকা লুট করার জন্য এই ষড়যন্ত্রটা করছে। দুর্নীতি সম্পর্কে সমাজের নৈতিক অবস্থানকে ভেঙ্গে দেয়ার এই চক্রান্তের কারণেই দুর্নীতির বিচার হয় না, বরং দুর্নীতিবাজের সন্মান বাড়ে।

যারা বলে উন্নয়ন হলে কিছু দুর্নীতি মানতে হবে তারা আসলে উন্নয়নের জয়গান গায় না, তারা দুর্নীতির মাহাত্ম প্রচার করে। উন্নয়ন এবং দুর্নীতি হাতে হাত ধরে এগুতে থাকলে উন্নয়ন যতটা না হয়, উন্নয়নের নামে দুর্নীতি হয় ঢের বেশি। এই পরিস্থিতির দিকেই খেয়াল রাখা জরুরি।

রূপকথাসম দুর্নীতির গল্প শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত। আসল কথা হল নৈতিকতা। রাজনীতিতে, প্রশাসনে, শিক্ষায়, সাংবাদিকতায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে নৈতিকতা বিসর্জনের সংস্কৃতি অনুশীলনের বেপরোয়া মনোভাব থাকলে দুর্নীতি বাড়বেই। এমন একটি সমাজ নির্মাণ করেছি আমরা যেখানে দুর্নীতিবাজের যাত্রাপথে সকলে মিলে পুষ্পবৃষ্টি করি। আর তাই জনসমাজ এখন সংকীর্ণ পচনশীল স্বার্থপরতায় আচ্ছন্ন।